সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৩০ কোটির মতো৷ জার্মানিতেই ৭০
লাখেরও বেশি ডায়াবেটিস রোগী আছেন৷ মোট জনসংখ্যার প্রায় নয় শতাংশ৷ তাই
রোগটিকে দমন করতে নানা রকম থেরাপি ও ওষুধপত্র বের করার চেষ্টা করছেন
গবেষকরা৷
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, সারা বিশ্বে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ২০৩০ সাল
নাগাদ ৪০ কোটিতে দাঁড়াবে৷ বিশেষ করে ভারত, চীন ও ব্রাজিলের মত উন্নয়নশীল
দেশগুলিতে রোগটির অগ্রযাত্রা বেড়েই চলেছে৷ এর প্রধান কারণ সেখানকার
মানুষদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন৷ স্থূলতা, চলাফেরার অভাব, মন্দ খাদ্যাভ্যাস
ইত্যাদি রোগটিকে বিশেষ করে প্রভাবিত করে৷ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলি এ
ক্ষেত্রে নিবিড় গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে৷ এটা একটা লাভজনক ব্যবসাও৷
ইন্সুলিনে নির্ভরশীলতা
ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগটি দুই ধরনের হয়ে থাকে: টাইপ ১ ও টাইপ ২৷
সাধারণত অল্পবয়সীরা আক্রান্ত হয় টাইপ ১ ডায়াবেটিসে৷ যেমনটি দেখা যায়
অলিভারের ক্ষেত্রে৷
হঠাৎ করেই সে ক্লান্তি বোধ করতে শুরু করে৷ তার ওপর আবার ওজন কমে যাওয়ার
লক্ষণ দেখা দেয়, বেড়ে যায় মূত্রত্যাগের বেগও৷ তখন অলিভারের বয়স ছিল ১৮৷ ১০
বছর ধরে হানোফার শহরের এই ছাত্র দৈনিক ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নিচ্ছে৷
অলিভার জানায়, রাতে বিছানায় যাবার আগে আমি ইনসুলিন ইঞ্জেকশন নেই৷ এটা ২৪
ঘণ্টা কাজ করে৷ কিন্তু তবুও আমি খাওয়ার আগে কিংবা খালি পেটে রক্ত পরীক্ষা
করে দেখি৷ প্রয়োজন হলে দ্রুত কাজ করে, এই রকম ইন্সুলিন দিয়ে আরো একটু নিয়ে
খাপ খাইয়ে নেই৷ তার মানে সারাটা দিনই রোগের ব্যাপারটা মাথায় থাকে৷ খাওয়া
দাওয়াও চিন্তাভাবনা করে করতে হয়৷'
অ্যান্টিবডির আশ্রয়
অল্পবয়সীদের যাতে সবসময় টাইপ ১ ডায়াবেটিস নিয়ে মাথা ঘামাতে না হয়, সেজন্য
গবেষকরা ইনসুলিনের বিকল্প কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করছেন৷ এর মধ্যে একটি
পদ্ধতি হল, দেহের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাতে ইনসুলিন উৎপাদনকারী
বেটাসেলগুলিকে আক্রমণ করতে না পারে, সে জন্যে এক ধরনের অ্যান্টিবডি তৈরি
করা৷
হানোফার শহরের মেডিকেল ইউনিভার্সিটির এল্মার ইয়েকেল এই প্রসঙ্গে জানান,
এটা রোগনির্ণয়ের সময় দেয়া এককালীন এক থেরাপি৷ এরপর রোগীকে আর চিকিৎসা দিতে
হয় না৷ একবারই দিতে হয় বলে এক আকর্ষণীয় পদ্ধতি এটি৷ এর মূল লক্ষ্য: রোগ
নির্ণয়ের সময় টিকে থাকা বেটাকোষগুলিকে রক্ষা করা ও কাজে লাগানো৷
আন্তর্জাতিক ক্লিনিক্যাল গবেষণায় এই পদ্ধতি নিয়ে মানুষের ওপর পরীক্ষা
নিরীক্ষা চালানো হয়েছে৷ এতে হানোফার'র মেডিকেল ইউনিভার্সিটিও অংশ নিয়েছে৷
তবে ফলাফলটা পাওয়া গেছে বিভিন্ন রকমের৷ ইউরোপ ও অ্যামেরিকার হালকা পাতলা
দেহের তরুণ ডায়াবেটিস রোগীরা অ্যান্টিবডির উপাদান থেকে উপকার পেয়েছে৷
কিন্তু এশিয়ান অঞ্চলের রোগীরা আশাব্যঞ্জক তেমন কিছু দেখাতে পারেনি৷
এল্মার ইয়েকেল জানান, আমরা মনে করি টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার
পেছনে এশিয়ার দেশগুলিতে অন্যান্য কারণ থাকতে পারে৷ জিনগত ও পরিবেশগত কারণে
শরীরের প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে৷ এই দুটোই এশিয়ার দেশগুলিতে
ভিন্ন রকমের হতে পারে৷ এছাড়া সেখানকার পরীক্ষিত ব্যক্তিরা স্থূল আকৃতির
ছিলেন৷
রক্তের স্টেমসেল
আরো কিছু গবেষণার মাধ্যমে বোঝা যাবে, কেন টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের সবার
ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডির উপাদান কাজে লাগছে না৷ অন্যদিকে ব্রাজিলের গবেষকরা
স্টেম সেল নিয়ে গবেষণা করছেন৷ এই পরীক্ষায় তরুণ রোগীদের নিজেদের দেহ থেকে
নেয়া রক্তের স্টেমসেল আবার ঢুকিয়ে দেয়া হয় তাদের শরীরে৷ এক্ষেত্রেও রয়েছে
ইমিউন সিস্টেমকে সতেজ করার প্রচেষ্টা৷ যাতে শরীরের বেটা সেলগুলি আর ধ্বংস
হতে না পারে৷ এ ব্যাপারে ক্লিনিক্ল্যাল পরীক্ষায় আশার আলো দেখা যাচ্ছে৷
আর একটি পদ্ধতি নিয়ে ইসরায়েল, অ্যামেরিকা ও জার্মানিতে চিন্তাভাবনা করা
হচ্ছে৷ যাতে দৃষ্টি দেয়া হয়েছে লিভারের দিকে৷ এল্মার ইয়েকেল'এর ভাষায়,
এবিষয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে৷ আমাদের দেহে প্রচুর পরিমাণে লিভার
সেল রয়েছে , যেগুলি প্রতিনিয়ত পুনর্গঠিত হচ্ছে৷ এই কোষগুলির আচার আচরণ
পরিবর্তন করে ইনসুলিন প্রস্তুককারী সেলে রূপান্তরিত করা যায় কিনা, সে
ব্যাপারে পরীক্ষা চলছে৷ প্রাণীর ক্ষেত্রে সাফল্যও দেখা গেছে৷ মানুষের
ক্ষেত্রে এটা একটা বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি হতে পারে কিনা, তা বোঝা যাবে
আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের মধ্যে৷
টিকা পদ্ধতি
তবে টাইপ ১ ডায়াবেটিস দমন করার ব্যাপারে আর একটি পদ্ধতি বেশ কিছুটা এগিয়ে
রয়েছে৷ আর তা হলো টিকা দিয়ে এই প্রকারের ডায়াবেটিস দমন করা৷ কয়েকটি
ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া গেছে৷ হয়তো বছর তিনেকের মধ্যে
প্রথম টিকাটি বাজারে আসবে৷ অন্যদিকে ডায়াবেটিস টাইপ ২-এর ক্ষেত্রে একটি
ভালো খবর রয়েছে৷ আর তা হলো, একটি ওষুধ কিছুদিনের মধ্যেই অনুমোদন পেতে
যাচ্ছে, যার নাম ‘ফরক্সিগা'৷ এর সাহায্যে কিডনিকে এমনভাবে উদ্দীপিত করা
হবে, যাতে রক্তের অতিরিক্ত শর্করা মূত্রের মাধ্যমে বের হয়ে যায়৷ সেক্ষেত্রে
রোগীদের আর ইন্সুলিন নেয়ার প্রয়োজন পড়বে না৷ সূত্র: ডিডব্লিউ
No comments:
Post a Comment