সরকারি আইনের তোয়াক্কা না করে নারায়ণগঞ্জে বাড়িভাড়া বাড়ছে লাগামহীনভাবে।
বাড়িওয়ালারা তাদের ইচ্ছামতো বাড়িভাড়া বাড়িয়ে দিচ্ছেন। শুধু বাড়িভাড়া নয়,
পানির বিল ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ানোর অজুহাতে ভাড়া ছাড়াই আদায় করা হচ্ছে
অতিরিক্ত টাকা।
তাছাড়া ভাড়া দেয়ার সময় নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের অগ্রিম টাকা।
বাড়িভাড়া আইনে বাড়িওয়ালাদের এসব স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা
নেয়ার সুযোগ থাকলেও সচেতনতার অভাবে বাড়িওয়ালাদের রোষানলে পড়ার ভয়ে
ভাড়াটিয়ারা এ ব্যাপারে আইনি ব্যবস্থার দিকে যাচ্ছেন না। ফলে এ সমস্যা থেকে
রেহায় মিলছে না ভাড়াটিয়াদের।
নগরীর আল্লামা ইকবাল রোডের বাসিন্দা শান্তনু। তিনি একটি ইন্স্যুরেন্স
কোম্পানির চাকরি করেন। তিনি জানান, ২০০৯ সালে তার বাড়িভাড়া ছিল সাড়ে সাত
হাজার টাকা। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে তার ভাড়া পাঁচশ টাকা বাড়ানো হয়। জুন
মাসে পানির বিল হিসেবে বাড়িওয়ালা তাকে মাসিক তিনশ’ টাকা বাড়তি দেয়ার
নির্দেশ দেন।
সে অনুযায়ী পানির বিল তার ভাগে কত আসে সে প্রশ্ন তুলে কোনো লাভ হয়নি। ২০১১
সালের জানুয়ারিতে এক হাজার টাকা ও ২০১২ সালের জানুয়ারিতে তার ভাড়া আরো এক
হাজার টাকা বাড়িয়ে মাসে এখন তার বাড়িভাড়া বাবদ গুণতে হয় ১০ হাজার।
তিনি আরো জানান, বিদ্যুৎ বিল নিয়েও রয়েছে ব্যাপক ঘাপলা। তাকে কখনই আসল বিল
দেয়া হয় না। বাড়িওয়ালা হাতে লিখে মিটার রিডিং দিয়ে একটি বিল তৈরি করে দেয়।
তাদের বিল্ডিংয়ের সব ভাড়াটিয়ার ধারণা, বাড়িওয়ালা তাদের কাছ থেকে প্রকৃত
বিদ্যুৎ বিলের দ্বিগুণ আদায় করে থাকেন।
এ নিয়ে বিল্ডিংয়ের ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে অনেক ঝগড়া হলেও বাড়িওয়ালার কথাই বহাল
থেকেছে। তারা বেশ কয়েকবার মামলা করতে যাওয়ার কথা ভেবেও বাড়িওয়ালাদের
রোষানলে পড়ার আশঙ্কায় তারা মামলা করতে যাননি।
এদিকে শহরের বাইরে নিম্ন মানের টিনসেড বাসাগুলিতেও একই অবস্থা। নারায়ণগঞ্জ
সিটি কর্পোরেশন এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলীর সরল খাঁর বাড়িতে পরিবার নিয়ে
২০১১ সাল পর্যন্ত ভাড়া থাকতেন আদমজী ইপিজেডের ইপিক গার্মেন্টের শ্রমিক আবুল
কাশেম প্রধান।
তিনি জানান, তার বেতন চার হাজার ৯০০ টাকা। দুই রুমের টিনশেড বাড়ির ভাড়া
ছিল সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে চাকরি করে সংসার
চালাতেন। কিন্তু ২০১২ সালের জানুয়ারিতে সরল খাঁ বাড়ির ভাড়া সাত হাজার টাকা
করে ফেললেন। নিজেদের বাজেটের মধ্যে বাড়িভাড়াও পাচ্ছিলেন না আবুল কাশেম। তাই
স্ত্রীকে সন্তানদেরসহ পাঠিয়ে দিয়েছেন চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে। নিজে ভাড়া
নিয়েছেন একটি মেস।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি রফিউর রাবিব জানান, বাড়িভাড়া
আইন ১৯৯৬ নামের একটি আইন আছে। কিন্তু এর প্রয়োগ নেই। আইন অনুযায়ী ভাড়া দুই
বছরের আগে বাড়ানো যাবে না। চুক্তিনামা থাকতে হবে। কিন্তু এসবের ধারে কাছেও
নেই নারায়ণগঞ্জের বাড়িওয়ালারা।
এ আইন মানানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে সিটি
করপোরেশন। তারা একটি নীতিমালা তৈরি করতে পারে। সে নীতিমালা পালিত হচ্ছে কি
না তা তারা এলাকাভিত্তিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করলেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি
হবে বলে মনে করেন তিনি।
কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) নারায়ণগঞ্জ শাখার সাধারণ
সম্পাদক ডা. শাহনেওয়াজ চৌধুরী জানান, বাড়িভাড়ার বিষয়টি নারায়ণগঞ্জে মাত্রা
ছাড়িয়ে গেছে। যেহেতু ভাড়াটিয়ারা এক্ষেত্রে অভিযোগ করতে চান না, তাই
ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বাড়িওয়ালারা ভাড়ার রশিদ দেয়া, ভাড়াটিয়ার
সঙ্গে চুক্তিনামা করাসহ বাড়িভাড়া আইন মানছেন কি না তা দেখতে পারে। এছাড়া
রেন্ট কোর্টটি সিটি করপোরেশনের আওতায় দিলেও তা কার্যকর হবে।
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী জানান,
বাড়িভাড়া বিষয় ঢাকা সিটি করপোরেশনের আগে উদ্যোগ নিয়েও বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ
করতে পারেনি। তবে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। কারণ বিষয়টি মাত্রা
ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি বাড়িভাড়া আইনটি দেখে এ ব্যাপারে সিটি করপোরেশন কি
ভূমিকা নিতে পারে তা দেখব।
No comments:
Post a Comment