Pages

Tuesday, October 2, 2012

‘হ্যাঁ- না’ ভোট ছাড়া আইন প্রণয়নে বেশিরভাগ এমপির ভূমিকা নেই :: জাতীয় :: বার্তা২৪ ডটনেট

‘হ্যাঁ- না’ ভোট ছাড়া আইন প্রণয়নে বেশিরভাগ এমপির ভূমিকা নেই :: জাতীয় :: বার্তা২৪ ডটনেট
 জাতীয় সংসদে আইন পাস বা সংশোধনীর ক্ষেত্রে ‘হ্যা-না’ ভোটদান ছাড়া এককভাবে তেমন অবদান রাখেন না অধিকাংশ সংসদ সদস্য। বর্তমান সংসদে আইন প্রণয়নে তাদের আগ্রহ বা ভূমিকা কম।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বর্তমান সংসদে ৩৫০ জন সদস্যর মধ্যে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ জন আইন প্রণয়ন বিলের বিষয়ের ওপর নোটিশ দেন। অনেকেরই এ ব্যাপারে কোনো উৎসাহ নেই। তারা শুধু বিল পাসের সময় ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে দায়িত্ব শেষ করেন।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করেছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান ও সাবেক স্পিকার, হুইপসহ বিশেষজ্ঞরা।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় সংসদে মহাজোট সরকারের তিন বছর নয় মাসে ১৪টি অধিবেশনের ৩২৭ কার্যদিবসে ১৯৬টি আইন পাস হয়েছে। এর মধ্যে বিরোধী দলসহ অন্যরা প্রায় ২ হাজার ৫০০টি নোটিশ ও  সংশোধনী প্রস্তাব দিলেও তা আলোচিত হয়নি।কারণ বিরোধীদলীয় সদস্যরা নোটিশ দিলেও তাঁরা সংসদে উপস্থিত থাকেন কম। তাই তাদের নোটিশও উত্থাপিত হয় না।

অন্যদিকে সরকারি দলের নির্দেশনার বাইরে সদস্যদের নোটিশ দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। ফলে  কোনো বিতর্ক ছাড়াই শুধু সরকারি দলের সদস্যদের ‘হ্যাঁ’ শব্দ উচ্চারণের মধ্য দিয়ে বর্তমান সংসদে ১৯৬টি বিল পাস হয়েছে। এসব বিল পাস হতে গড়ে সময় লেগেছে ২ থেকে ৫ মিনিট।

জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ বার্তা২৪ ডটনেটকে বলেন, ‘আসলেই আইন প্রণয়নের বিষয়ে অধিকাংশ সংসদ সদস্যর আগ্রহ কম। তারা বিল পড়েও দেখেন না। এ বিষয়ে তাদের জানার আগ্রহও কম। তারা সবসময় স্থানীয় উন্নয়ন নিয়ে বেশি ভাবেন। দেশের জনগণও তা-ই চায়। আমি নিজেও যখন শুধুই সংসদ সদস্য ছিলাম, বিল নিয়ে ভাবতাম না।’

তিনি আরো বলেন, “একটি বিল মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সংসদীয় কমিটি দেখার পর এতে সাধারণত করণিক ভুল ছাড়া অন্য কোনো ভুল থাকে না,  যে কারণে সরকারি বা বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের কোনো নোটিশ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী মন্ত্রীরা সংসদে বিল উত্থাপন করেন। এরপর মন্ত্রী ইচ্ছা করলে সেই বিল জনমত যাচাই বা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। সাধারণত মন্ত্রী জনমত যাচাই বা বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করেন না, কিন্তু সংসদীয় কমিটিতে পাঠিয়ে থাকেন।  সেখান থেকে সংসদে ফিরে আসার পর এমপিরা বিলটির ব্যাপারে জনমত যাচাই-বাছাই কমিটিতে পাঠানো এবং সংশোধনী প্রস্তাব আনতে পারেন। কিন্তু বর্তমান সংসদে এমপিরা তা করেন না।”

সংসদের কার্যপ্রবাহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বর্তমান সংসদে এ পর্যন্ত মোট ১৯৬টি বিল পাস হয়েছে। প্রথম অধিবেশনে ৩২টি, দ্বিতীয় অধিবেশনে ২৩, তৃতীয় অধিবেশনে ১১টি, চতুর্থ অধিবেশনে ২৩টি, পঞ্চম অধিবেশনে ২৪টি, ষষ্ঠ অধিবেশনে ১৩টি, সপ্তম অধিবেশনে ৪টি, অষ্টম অধিবেশনে ৬টি, নবম অধিবেশনে ৮টি, দশম অধিবেশনে ২টি, ১১তম অধিবেশনে ৭টি, ১২তম অধিবেশনে ১৫টি, ১৩তম অধিবেশনে ১৫টি ও ১৪তম অধিবেশনে ১৩টি।

এসব বিলের ব্যাপারে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রায় ২ হাজার ৫০০ নোটিশ দিয়েছেন। স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম একাই দিয়েছেন ৫ শতাধিক নোটিশ। বিপরীতে সরকারি দলের সদস্যদের নোটিশের সংখ্যা ২০ থেকে ২৫। তবে মাঝেমধ্যে সরকারি ও বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, চিফ হুইপ আব্দুস শহীদ, মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকসহ অনেকেই বিলের ওপর অনির্ধারিত আলোচনা করেছেন।

তবে সরকারি ও বিরোধীদলের যথাযথ বিতর্ক ছাড়াই বেশির ভাগ বিল পাস হয়েছে। এর কারণ বিরোধী দলের অনুপস্থিতি।

সংসদের বুলেটিনে দেখা গেছে, বর্তমান সংসদের ৩২৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল উপস্থিত ছিল ৭৪ দিন। এ সময়ের মধ্যে ১৯৬টি বিল পাস হলেও বিরোধী দল ৩৯টি বিল পাস হওয়ার সময় সংসদে উপস্থিত ছিল। অন্য সব বিল পাস হয়েছে সরকারি দল ও একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিমের উত্থাপিত নোটিশের ভিত্তিতে। অনুপস্থিত থাকায় এসব বিলের ক্ষেত্রে বিএনপির নোটিশ থাকলেও উত্থাপিত হয়নি। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দল সংসদে থাকলেও নোটিশদাতা অনুপস্থিত। এর ফলে বিরোধী দলের জমা দেওয়া নোটিশের ৯০ শতাংশই উত্থাপিত হয়নি।

 জানা গেছে, নবম জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ২০০৯-এর ৮ জুলাই মাত্র ২২ মিনিটে সাতটি বিল পাস হয়েছে। বিলগুলো হলো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সংক্রান্ত। এর মধ্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিলটি পাস হয়েছে মাত্র দেড় মিনিটে। পঞ্চম অধিবেশনে স্ট্যাম্প (সংশোধন), ইনকাম ট্যাক্স (সংশোধন) ও ক্যাডার-বহির্ভূত প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা (শুল্ক, আবগারি ও ভ্যাট) নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলি (সংশোধন) এই তিনটি বিল পাস হতে সময় লেগেছে মাত্র ১০ মিনিট।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আরো বেশ কয়েকটি বিল দেড়-দুই মিনিটে পাস হয়েছে।  প্রধান বিরোধী দল না থাকলেও ওই সময় ৬০টির মতো বিলে একমাত্র স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিমের নোটিশ উত্থাপিত হয়েছে। তা না হলে এসব বিলও তিন-চার মিনিটে পাস হয়ে যেত।

আইন মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ফজলে রাব্বি মিয়া বার্তা২৪ ডটনেটকে বলেন, “বিরোধী দল সংসদে না থাকলে প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সরকারি দল। এতে সরকারি দল খেয়াল-খুশিমতো কাজ করার সুযোগ পায়। ফলে আইনগুলো খুবই দুর্বলভাবে পাস হয়। বিরোধী দল থাকলে ত্রুটিপূর্ণভাবে বিল পাস হওয়ার সুযোগ কম থাকে।”

সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বার্তা২৪ ডটনেটকে বলেন, “বিলের ব্যাপারে নোটিশ দেওয়া বড় ধরনের কোনো কঠিন কাজ নয়। তা সত্ত্বেও এ বিষয়ে  নোটিশ দেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের এখানে তৈরি হয়নি। সুযোগ থাকলেও সরকারি দলের এমপিরা সচরাচর সরকারি সিদ্ধান্তের বাইরে নোটিশ দেন না। আর বিরোধী  দল শত শত নোটিশ দিলেও আলোচনার সুযোগ দেওয়া হয় না। এ কারণে অধিকাংশ বিল খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে পাস হয়ে যায়।”

বিল পাসের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্রও আছে। বিরোধী দলের উপস্থিতিতে বিল পাসের সময় তুমুল বিতর্কের কারণে সংসদ ছিল প্রাণবন্ত। এ ক্ষেত্রে অনেক বিল পাস হতে সময়  লেগেছে ৩০ মিনিট, আবার কখনো এক ঘণ্টারও বেশি। এসব বিলে বিরোধী দলের সদস্যদের সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণের নজিরও রয়েছে। সবচেয়ে  বেশি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে ফজলুল আজিমের। এর বাইরে বিএনপির জাফরুল ইসলাম  চৌধুরী, নিলুফার চৌধুরী মনি, রাশেদা বেগম হিরা ও জামায়াতের হামিদুর রহমান আযাদের সংশোধনী প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে।

সংসদ সচিবারয় সূত্রে জানা গেছে, দল থেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে নোটিশ দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। কেউ দলীয় নির্দেশনা বা চিফ হুইপের পরামর্শ ছাড়া নোটিশ দিলে অনেক ক্ষেত্রেই আমলে নেওয়া হয় না। তারপরও মহাজোটের বেশ কজন এমপি দলীয় নির্দেশনার বাইরে সংবিধান সংশোধনীতে উত্থাপিত বিলের ওপর সংশোধনী প্রস্তাব দেন, যা পরে তুলে নেওয়া হয়। সরকারি বিলে বড় ধরনের  কোনো অসঙ্গতি দেখা দিলে শুধু তখনই বোঝাপড়ার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কয়েকজন দলীয় সদস্যকে দিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়, যে কারণে ফজলে রাব্বি মিয়া, আ ক ম মোজাম্মেল হক, আবদুল মতিন খসরুসহ আরও দু-একজনকে  বেশি নোটিশ দিতে দেখা যায়।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু এর সঙ্গে বিলসংক্রান্ত নোটিশের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও অনেকেই মনে করেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিলের ব্যাপারে নোটিশ দিলে তা  যে কোনো সময় দলের বিপক্ষে ভোট হিসেবে গণ্য হতে পারে। এ আশঙ্কায় সদস্যরা সচরাচর দলীয় নির্দেশনার বাইরে নোটিশ দেন না।

এ বিষয়ে স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম বার্তা ২৪ ডটনেটকে বলেন, “আমি প্রতিটি আইন পাস হওয়ার আগে পড়ি। তারপর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশোধনী দেওয়া যাবে সেগুলো ঠিক করি। এরপর স্পিকারের কাছে আবেদন করি। আমার অনেক নোটিশের উপর আলোচনা করতে দেয়া হয়, আবার অনেক নোটিশ গ্রহণ করা হয় না।”

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক বার্তা২৪ ডটনেটকে বলেন, “বর্তমান সংসদের মেয়াদ সাড়ে তিন বছর পার হয়েছে। এখনো বেশির ভাগ নতুন এমপির নোটিশ দেবার বিষয়ে ধারণা কম। তাদের দক্ষ করে তোলার জন্য সংসদ থেকে কোনো প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়নি। এ কারণে নতুনেরা নোটিশের ব্যাপারে আগ্রহী নন।”


এ বিষয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “নতুন আইন পাস ও পুরনো আইন সংশোধনীর বিষয়টি  আমাদের পুরনো সমস্যা । জাতীয় সংসদে আইনগুলো যখন আসে তখন ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয় না। আইনের খসড়া আসার পরে জনমত নেওয়া দরকার।”

তিনি বলেন, “আইন পাসের ক্ষেত্রে সরকারি দলের চেয়ে বিরোধী দলের ভূমিকা অনেক বেশি থাকে। বর্তমান বিরোধী দল সংসদ বর্জন করার কারণে সরকারি দল সুযোগ গ্রহণ করছে। কারণ ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের আইন পাসের ক্ষেত্রে ‘হ্যাঁ-না’ ভোট ছাড়া তেমন ভূমিকা থাকে না।”

তিনি আরে বলেন, “নতুন নতুন আইন পাস হওয়ার ক্ষেত্রে সংসদে বিতর্ক ও জনমত যাচাই প্রয়োজন। সংসদে যদি এ ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় তাহলে গণতন্ত্রের প্রতিফলন ঘটবে।”

No comments:

Post a Comment