একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আটক
জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের ষষ্ঠ সাক্ষী
জবানবন্দি দিয়েছেন।
সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী ডাক্তার মো.হাসানুজ্জামান (৬৭) তার জবানবন্দি পেশ করেন।
জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা করার জন্য আগামী ৫ সেপ্টেম্বর দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল।
জাবানবন্দিতে সাক্ষী হাসানুজ্জামান বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ শুরু আগেই আমার ভাই পাকিস্তানের নৌবাহিনী থেকে ছুটি নিয়ে একমাসের জন্য বাড়িতে আসেন। আমার শ্বশুর বাড়ি রামগড় গ্রামের সন্নিকটে আহাম্মদ নগর হাইস্কুলে পাকসেনা ও রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করে। সেখানে ব্যাপক হত্যা নির্যাতন চালানো হতো বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে ধরে এনে। শ্বশুর বাড়ির কাছে ক্যাম্প থাকায় আমার ছোট ভাই কাম্পটি রেকি করেন। আমার শ্বশুর বাড়িতে ৯১৭১ সালের ৩০ জুন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে দরজায় কড়া নেড়ে ভাই ভাই বলে ডাকতে থাকেন এবং ক্ষুধার্ত বলে তারা খাবার চায়। মুক্তি বাহিনীর নাম শুনে আমার ছোট ভাই ঘর থেকে দরজা খুলে অতি উৎসাহে বের হয়ে আসে এবং আমার চাচা শ্বশুর মকবুল হোসেন তাদেরকে বেঞ্চে বসতে দিয়ে একটি পাতিলে করে মুড়ি খেতে দেয়। আরেক চাচা শ্বশুর সৈয়দ রহমান ও ভাইয়া ভাই জমসেদ আলী তাদের কাছে যায়।”
তিনি আরো বলেন, ওই সময় আমার চাচা শ্বশুর আচঁ করতে পারেন যে এরা মুক্তিযোদ্ধা নন। আল বদরের কামারুজ্জানরা। তখন তারা আমার ভাইকে অনেক কৌশলে তাদের বলয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছে। আমার ভাই বুঝতে পারেননি। তখন কামারুজ্জান আমার ভাইকে বলেন, “আমরা আলবদর ক্যাম্পে আক্রমণ করবো। পাক বাহিনীর ক্যাম্পটি যেন দেখিয়ে দেয়া হয়।”
সাক্ষী বলেন, “ভাইকে নিয়ে তারা যখন ক্যাম্পের দিকে রওয়ানা দেন তখন চাচা শ্বশুর তাদের বসা বেঞ্চে ম্যাগজিম ভর্তি একটি অস্ত্র দেখতে পান। এটা ফেরত দিতে তাদের কাছে যায়। ফেরত দিতে গেলে তারা তাকে তাদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করেন। তাদেরকে পাক বাহিনীর ক্যাম্প দেখিয়ে দেয়ার পরেও তারা তাকে দমক দিয়ে সঙ্গে যেতে বলেন।”
সাক্ষী বলেন, “আমার ভাই বুঝতে পেরে তখন তিনি প্রস্রাবের কথা বলে পাট ক্ষেত দিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। ওই সময় তার গায়ে সাদা রঙের গেঞ্জি পড়া ছিল বলে শুনেছি। আলবদও বাহিনীর লোকেরা পাট ক্ষেতে অনেক খোঁজা খোঁজির পরে আমার ভাইকে তাদের ক্যাম্পে নেয়া হয়। ক্যাম্পে নিয়ে তারা আমার ভাইকে সারা রাত অমানুষিক নির্যাতন চালায়। তার একটি কান কেটে ফেলা হয় বলে জানায় ওই ক্যাম্পে এবং আশে পাশে কর্মরত লোকেরা “
সাক্ষী আরো বলেন, “আহাম্মদ আলী মেম্বার আমার ছোট ভাইয়ের নির্যাতনের চিহ্ন দেখেন। পরের দিন সকালে ক্যাম্পের বাইরে রাস্তায় এনে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে আমার ভাইয়ের লাশটি টেনে হিচড়ে নিয়ে ওই রাস্তার পাশে একটি পুলের নিচে ফেলে দেয়া হয়।”
তিনি বলেন, “দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমি আমার শ্বশুর বাড়িতে গেলে আমার ভাইয়ের হত্যার বর্ণনা চাচা শ্বশুর ও তার ভাই শমসের আলীর কাছে ও অন্যান্য কর্মরত শ্রমিদের কাছে থেকে শুনেছি।”
আমার চাচা শ্বশুর সৈয়দ রহমান আমাকে স্পষ্ট করে জানান যে আলবদর নেতা কামারুজ্জামানকে তিনি চিনতে পেরেছেন। তাদের কথার ভিত্তিতে আলবদর নেতা কামারুজ্জানসহ দশ জনের মোট ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
এ মামলা দায়েরের পরে একজন অফিসার তদন্ত করতে আসেন। পরে মামলার কোনো অগ্রগতি না দেখে আমার চাচাত ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আমার পিতা শেরপুরে কোর্টে যায়।
সাক্ষী বলেন, “আমি কামারুজ্জামানকে চিনি না। তবে পত্র পত্রিকায় তার ছবি দেখেছি। পরে সাক্ষীকে একটি প্রশ্ন করে আসামির আইনজীবী জানতে চায়, যে আপনার বাড়ি এবং আসামি কামারুজ্জামানের বাড়ির দূরত্ব কত। জবাবে সাক্ষী বলেন ১৫ মাইল হবে।
এর আগে সকালে কামারুজ্জামানের পঞ্চম সাক্ষীকে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী কফিল উদ্দিন চৌধুরী। জেরায় তাকে বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন করেন আসামীপক্ষের আইনজীবী। পরে ষষ্ঠ সাক্ষীর জেরা আগামী পাঁচ সেপ্টম্বর পর্যন্ত মূলতবি করা হয়।

No comments:
Post a Comment