গত বছরের জুলাইতে বিএনপির হরতালে জাতীয় সংসদের সামনে মানিক মিয়া
এভিনিউতে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর পুলিশি হামলার
ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি মর্মে আদালতে প্রতিবেদন
দাখিল করেছে পুলিশ। প্রতিবেদনটি গ্রহণ করে ঢাকার একটি আদালত মামলাটি খারিজ
করে দিয়েছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ ও গোয়েন্দা তথ্য
বিভাগের সহকারি পুলিশ কমিশনার মো. ওবায়দুল হক সোমবার ঢাকার মুখ্য মহানগর
হাকিমের আদালতে এ প্রতিবেদন দাখিল করেন।
মামলায় বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া প্রতিবেদনটির বিরুদ্ধে
আদালতে নারাজি আবেদন দাখিলের জন্য সময় চান। তবে মহানগর হাকিম মো. হাসিবুল
হকের আদালত পুলিশি প্রতিবেদন গ্রহণ করে বাদীর আইনজীবীর সময় আবেদন নাকচ করে
দেন এবং মামলাটি খারিজ করে দেন। আদালতের এ আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন আবেদন
করবেন বলে জানিয়েছেন অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিপি জয়নাল আবেদীন ফারুক এবং তার সাথের অনান্য
রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে সংসদ সদস্য পাপিয়া, শাম্মী আক্তারের অতিরিক্ত
বাড়াবাড়ির কারনে হরতালের সময় ওই ঘটনার অবতারণা হয়েছে। আর বিশৃঙ্খলার সময়
কোন কোন পুলিশ আঘাত করেছে তা হেলমেট পরা থাকার কারণে তাদের শনাক্ত করা
যায়নি। এ ঘটনাটি তদন্ত করে আসামীদের (পুলিশ) বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা
পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
এ প্রতিবেদনের বিরোধিতা করে মামলার বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ
মিয়া বলেন, দেশের পুলিশ আজ কি ধরণের আইনের শাসন নিশ্চিত করছে তার উৎকৃষ্ট
প্রমাণ এই পুলিশ প্রতিবেদন।
তিনি বলেন, দেশের মানুষ জানে এবং মিডিয়া ও দেখেছে সরকারের পুলিশ বাহিনী
কিভাবে ভিপি জয়নাল আবদিন ফারুককে পিটিয়ে তার শরীরের কাপড় খুলে ফেলে তাকে
আহত করেছে।
তিনি বলেন, বিরোধী নেতাকে পেটানো সে সব পুলিশের পদোন্নতিও হয়েছে বলে
মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে। আর আজ তদন্তকারী কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং
মিডিয়ার তথ্য সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে কোনো প্রকার তথ্য সংগ্রহ ছাড়াই
সরকারের নির্দেশ মোতাবেক এ একপেশে অসত্য প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
প্রসঙ্গত, ওই হামলার ঘটনায় বিএনপির সংসদ সদস্য আশ্রাফ উদ্দিন নিজাম বাদী
হয়ে গত বছরের ১২ জুলাই সিএমএম আদালতে পুলিশের ২ কর্মকর্তা এবং অজ্ঞাতনামা
আরো ২৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন।
ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশকে প্রতিবেদন দিতে আদেশ দেন।
সেদিন যা ঘটেছিল
গত বছরের ৬ জুলাই বিএনপি’র হরতাল চলাকালে জাতীয় সংসদে দলটির চিফ হুইপ
ফারুকের ওপর ওই পুলিশি হামলার ঘটনা ঘটে। ‘‘শুয়ারের বাচ্চা, থাপরাইয়া তোর
দাঁত ফেলে দেবো’’- পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এভাবেই অকথ্য গালিগালাজ
দিয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে পেটাতে শুরু করেন। বসের এই মারমুখী আচরণ দেখে
কনস্টেবলরা পরম উৎসাহে জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুরু হয়
কিল-ঘুষি-লাথি। টেলিভিশনে প্রচারিত এই চিত্র দেখে যে কারো এটাই ভাবা
স্বাভাবিক যে, এ যেন সংঘবদ্ধ হায়েনার আক্রমণ। এমন কঠিন মন্তব্য করেছেন একটি
টেলিভিশন চ্যানেলের ক্যামেরাম্যান। তিনি ওই সময় সেখানে দায়িত্বে ছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী মিডিয়াকর্মীরা জানান, শুরু থেকেই মারমুখী আচরণ করছিলেন
ঢাকা মহানগর পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) বিপ্লব কুমার
সরকার। বিএনপির ৩০ জন এমপিকে ঠেকাতে সেখানে পুলিশ সদস্য ছিলেন শতাধিক।
ন্যাম ভবনের সামনে তারা সমবেত হওয়ার সাথে সাথে তাদের ঘিরে ফেলে পুলিশ।
ফারুকের গায়ে ছিল নীল-সাদা স্ট্রাইপের গেঞ্জি। পুলিশের এক কর্মকর্তা তাকে
টিটকারি দিয়ে বলেন, হরতাল করবি, এই কারণে গেঞ্জি পড়ে বের হয়েছিস। দেখি,
কিভাবে হরতাল করিস। এরপরই দু’পক্ষে কথা কাটাকাটি শুরু হয়।
এক পর্যায়ে এক কথা-দু’কথায় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপকে গালিগালাজ শুরু করে
পুলিশের দুই কর্মকর্তা। উত্তেজিত হয়ে বিপ্লব কুমার সরকার বলেন, ‘‘শুয়ারের
বাচ্চা, থাপরাইয়া তোর দাঁত ফেলে দেবো’’। তখন ফারুক চিৎকার করে বলতে থাকেন,
“পারলে ফেল দেখি।” তৎক্ষণাৎ এডিসি হারুন-অর-রশীদ পেছন দিক থেকে তেড়ে এসে
অন্যান্য পুলিশ কনস্টেবলদের নিয়ে ফারুকের ওপর হামলা চালান। ঊর্ধ্বতন
কর্মকর্তা বিপ্লব সরকার ও হারুন-অর-রশিদকে অনুসরণ করে তাদের অধীনস্থ পুলিশ
সদস্যরা অমানবিকভাবে পেটাতে থাকেন জয়নুল আবদিন ফারুককে। কর্মকর্তারা চিৎকার
করে বলতে থাকেন, “মার”। কনস্টেবলরা মৌমাছির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ফারুকের ওপর।
শুরু হয় কিল-ঘুষি-লাথি।
তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। টানাহেঁচড়াতে
ফারুকের গেঞ্জি খুলে নেয় পুলিশ। তখন দেখা যায়, ফারুকের মাথা থেকে রক্ত ঝরে
সারা গা রক্তাক্ত হয়ে গেছে।
এই অবস্থায় বিএনপির অন্যান্য এমপিরা ফারুককে ন্যাম ভবনের ভেতরে নেয়ার চেষ্টা করেন। সেখানেও পুলিশ তাকে তাড়া করে।
ফারুক লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। সেখানে থেকে পুলিশ সদস্যরা তাকে
টেনে-হিঁচড়ে চ্যাংদোলা করে গাড়িতে ওঠায়। গাড়ির কিনারে উঠিয়েই ড্রাইভার গাড়ি
চালিয়ে দেয়। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে যান ফারুক। এ সময় তিনি মাথায় ভয়ানক আঘাত
পান। নিস্তেজ হয়ে কংক্রিটের সড়কে পড়ে থাকেন। তার জিভ বেরিয়ে আসে। এরপর তার
সহকর্মীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান
কে এই বিপ্লব সরকার ও হারুন-অর-রশীদ
পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানা যায়, এসি বিপ্লব কুমার সরকারের জন্ম কিশোরগঞ্জ
সদরের খরমপট্টিতে। ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন সক্রিয় ছাত্রলীগ নেতা। তিনি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখার ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তিনি
২১তম বিসিএসে পুলিশে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।
অন্যদিকে, তেজগাঁও জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এডিসি) হারুন-অর-রশীদও
ছিলেন ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। তার জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামন
উপজেলার গাগড়া ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে। তিনি ২০তম বিসিএসে পুলিশে
নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

No comments:
Post a Comment