Pages

Friday, September 7, 2012

হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সংসদে মাফ চাইলেন অর্থমন্ত্রী

হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে সংসদে মাফ চাইলেন অর্থমন্ত্রী

 হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনায় সংসদে মহাজোট সরকারের সিনিয়র এমপিদের তোপের মুখে পড়ে অবশেষে মাফ চাইতে বাধ্য হয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। এ কেলেঙ্কারি নিয়ে দেশে বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি নিজেকে এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে ঘৃণিত ব্যক্তি বলে দোষ স্বীকার করেন।

বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ‘অবিলম্বে খুলনা উন্নয়ন ব্যাংক স্থাপন করা হোক’ সম্বলিত সংসদ সদস্য নূর আফরোজ আলীর সিদ্ধান্ত প্রস্তাব বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সূত্র ধরে তারা এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

এর আগে হলমার্ক নিয়ে সংসদে সরকার দলীয় সিনিয়র এমপিদের তোপের মুখে পড়েছে অর্থমন্ত্রী। এ সময় তারা বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগকে এ ঘটনায় দায়ী করে বক্তব্য দেন। এত বড় কেলেঙ্কারির পরেও কেন সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা হয়নি, তার কারণ জানতে চান তারা। ২০১০ সালে এ ঘটনার শুরু হলেও এতদিন কেন অর্থমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে চুপ ছিল তার কারণও জানতে চান তারা। একই বিষয়ে দোষীদের স্পষ্ট বিবৃতি জাতির সামনে উপস্থাপনের দাবি জানানো হয়।

তোফায়েল আহমেদ একই বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘‘হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে জনগণ যে মতামত দিচ্ছে তারও মূল্যায়ন করতে হবে। আমরা যখন আমাদের নির্বাচনী এলাকায় যাই মানুষ আমাদের প্রশ্ন করে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে আমরা কি করছি।’’

তিনি বলেন, ‘‘যে মুহূর্তে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো, সে সময়ে একটি কেলেঙ্কারি নিয়ে যে লেখালেখি হচ্ছে তার নিরসন হওয়া উচিত। যে ব্যাংকটি নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। সেখানকার পরিচালনা পর্ষদ তার দায় এড়াতে পারে না। ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে দোষী ব্যক্তি আস্তে আস্তে জামানত ফিরিয়ে দিবেন। আমি মনে করি যে ব্যাংক নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে তার চেয়ারম্যানকে কেন রাখা হয়েছে? কেন তাকে অপসারণ করা হয়নি?’’

অপর এমপি মজিবুল হক চুন্নু  বলেন, ‘‘এতবড় ঘটনার পরেও সরকার কেন চুপ। যে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপ-পরিচালকের সহযোগিতায় এটা হয়েছে এখনো কেনো তার মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেয়া হয়নি। কেন তাকে সরিয়ে নিরপেক্ষ লোক বসিয়ে তদন্ত করা হয়নি। দেশবাসী তা জানতে চায়।’’

রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘‘এ বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্ত ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ দেখিনি আমি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের স্পষ্ট বিবৃতি দিতে হবে।

আব্দুল জলিল বলেন, ‘‘আমি ব্যক্তিগতভাবে একটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে জড়িত। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি উপরের মহলের সহযোগিতা ছাড়া এতবড় দূর্নীতি সম্ভব নয়। পুরো বিষয়টি জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। ধামাচাপা দেয়া চলবে না।’’

এর আগে অর্থমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, ‘‘হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। জালিয়াতির সুযোগে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অনেক টাকা পাচার করা হয়েছে। দায়ীদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এ ঘটনায় সাক্ষ্য নেয়া হচ্ছে। বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিৎ। একই সঙ্গে জড়িতদের এমন শাস্তি দেয়া উচিত যাতে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে দেশে আর না ঘটে।

তিনি বলেন, ‘‘এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ধরার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমরা দুইজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেছি। ১৭ জনকে শোকজ করেছি। এ ধরনের শাস্তি অতীতে এদেশে আর কেউ দেখেছে বলে আমার জানা নেই।’’

তিনি বলেন, ‘‘হলমার্ককে আমরা মোটামুটি হলমার্ক কেলেঙ্কারি বলি। এটা ২০১০ সালে ধরা পড়ে। ২০১১ সালে সোনালী ব্যাংক দু’টি প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু পরে দেখা যায় এ দু’টি প্রতিবেদন অন্যায়ভাবে দাখিল করা হয়। এ হলমার্ক ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়। কিন্তু ঋণের নামে তারা অনেক টাকা পাচার করে। এটা তারা অন্যায় করেছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি অডিট পরিচালনা করে। তাদের অডিটেও হলমার্কের কেলেঙ্কারি ধরা পড়ে। তাদের প্রতিবেদনে তারা হলমার্কের ঘটনার সঙ্গে কিছু দুষ্টু লোক জড়িত বলে অভিযোগ করে। একই সঙ্গে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলে।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা ঘটনাটি তদন্তকারী সব প্রতিষ্ঠানকে বলেছি সুষ্ঠুভাবে তদন্তটি চালিয়ে নেয়ার জন্য। ইতিমধ্যে আমরা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিয়েছি। ঘটনার প্রেক্ষিতে লোকাল এলসি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন বিধান জারি করেছে। দুই দিনের মধ্যেই টাকা জমা দিতে হবে। আগে অনেক দিন পর টাকা জমা দিতে পারতো।’’

তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে বর্তমানে সরকারি মালিকানাধীন চারটি বিশেষায়িত, ৩০টি বেসরকারি ও বিদেশি নয়টি ব্যাংক মিলিয়ে মোট ৪৭টি ব্যাংক কাজ করছে। শিগগিরই আরো চারটি ব্যাংক এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এছাড়া আরো দু‘টি বিশেষ ব্যাংক আছে। এগুলো কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।’’

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘‘বাংলাদেশে বর্তমানে মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষকে ব্যাংক সেবা প্রদান করতে পারছে। সেবা বাড়াতে ব্যাংকের সংখ্যা আরো বাড়ানো দরকার।’’

তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেশে ক্ষুদ্র ঋণের প্রসারসহ কৃষি ও পল্লী উন্নয়নে কাজ করছি। এ নীতিমালায় আমাদের উন্নয়ন হয়েছে ও অর্থনীতির গতি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের মুদ্রার মান ও প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সর্বোচ্চ। রেমিট্যান্সও সন্তোষজনক। অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভালো আছে। তাই অর্থনীতি নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।

তিনি বলেন, ‘‘নোয়াখালী, নারায়ণগঞ্জ ও নওগাঁয় জেলা ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব আমাদের কাছে এসেছে। আমরা এগুলো ভেবে দেখবো। তবে এ মুহূর্তে করা সম্ভব নয়।’’

এ বিষয়ে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে আব্দুল মতিন খসরু বলেন, ‘‘অর্থমন্ত্রী আজ কেন এ বিষয়ে কথা বলছেন। হলমার্ক কেলেঙ্কারির ঘটনা গত দুই বছর ধরে চলছে। ব্যাংক থেকে হাতিয়ে নেয়া টাকা কোথায় গেলো জাতি জানতে চায়। যেখানে তিন হাজার টাকা চুরি গেলে জেল হয়। সেখানে এত বড় কেলেঙ্কারির কি বিচার হবে আমরা দেখতে চাই।’’

No comments:

Post a Comment