Pages

Thursday, November 15, 2012

অপহরণকারীদের দেড় মাস আগে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনা হয়


‘৫০ লাখ টাকার’ মুক্তিপণে আপস

গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে নাজিম, আমির আর নিরঞ্জন নামে তিন সন্ত্রাসীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ছাড়িয়ে আনেন কেরানীগঞ্জের যুবলীগের এক নেতা। এদের ছাড়িয়ে আনতে ওই নেতার ৪ লাখ টাকা খরচও হয়েছে। উদ্দেশ্য— বড় কোন অপারেশনে তাদের ব্যবহার করা। হয়েছেও তাই। এদের দিয়েই পাওয়া গেছে ‘৫০ লাখ টাকা’। আর এই টাকাটা দিয়েছেন কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের পশ্চিমপাড়ার বিমল মণ্ডল। কারণ—তার একমাত্র ছেলে পরাগ মণ্ডলকে অপহরণ করেছিল এই গ্রুপটি। এই অপহরণের ঘটনা দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সরকারের শীর্ষ মহল পর্যন্ত নড়েচরে বসে। শেষ পর্যন্ত যেভাবেই হোক ফিরে পাওয়া গেছে জীবিত পরাগকে। যদিও টাকা দেয়া, না দেয়া চলছে এক রহস্যময় লুকোচুরি। র্যাব বলছে, ৫০ লাখ টাকা দিয়েই মুক্ত করা হয়েছে পরাগকে। তাদের কাছে পরাগের বাবার কথপোকথনের রেকর্ডও আছে। আর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) বলছে, টাকা দিয়ে নয়, এমনিতেই উদ্ধার হয়েছে পরাগ। এমন পরিস্থিতিতে ‘চুপ’ হয়ে গেছেন বিমল।

এদিকে পরাগ অপহরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী মামুনকে ডিবি আটক করেছে। তার মাধ্যমে পরাগ অপহরণের বিস্তারিত জানতে পারে পুলিশ। সে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ হেফাজতে ছিল। তাকে পরাগ উদ্ধারের পর ঐ রাতে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় সোপর্দ করা হয়। গত রাতে মামুনকে দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ থানায় পুলিশ পরাগ অপহরণের মামলায় গ্রেফতার দেখায়।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অপহরণকারী সাতজনকে শনাক্ত করেছে। এদেও মধ্যে ছয়জন ডেমরা এলাকা একটি কলেজের ছাত্র।

জমি নিয়ে যুবলীগ নেতার সঙ্গে বিরোধ

পরাগ অপহরণের ঘটনায় তার বাবা বিমল মণ্ডলের সঙ্গে স্থানীয় এক যুবলীগ নেতার জমি নিয়ে বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জমি নিয়ে বিরোধের ঘটনা সম্পর্কে জানা গেছে, শুভাঢ্যা ইউনিয়নের ৩০ শতাংশ জায়গা ৩০ বছর আগে কেনেন বিমল মণ্ডলের বাবা মৃত জীবন মণ্ডল। এই বাড়িতেই বাসবাস করেন বিমল। এ বছরই প্রতিবেশী নিতাই চন্দ্র মন্ডল এবং তার ভাতিজা গণেষ মন্ডল এই সম্পত্তির ১৪ শতাংশের ওয়ারিশ বলে দাবি করেন। এই জায়গা দখলে নেয়ার জন্য তারা আইনগত অধিকার (পাওয়ার অব এটর্নি) দেন শুভাঢ্যা ইউনিয়নের সাবেক যুবলীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম জুয়েল মোল্লাকে। জুয়েল মোল্লা জমি ছেড়ে দিতে বিমলকে বেশ কয়েকবার হুমকিও দেন। পরে স্থানীয় মুরুব্বিদের হস্তক্ষেপে একটা আপসরফা হয়। যাতে বলা হয়, জমি বিমলেরই থাকবে, তার নামে জমির রেজিস্ট্রেশন (নিবন্ধন) হবে। বিনিময়ে যুবলীগ নেতাকে দিতে হবে ১৭ লাখ টাকা। গত রবিবার বিমলকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়ে টাকা নেয়ার কথা ছিল যুবলীগ নেতার।

‘৫০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত’

সূত্র জানায়, জমি নিবন্ধন করে দেয়ার বিষয়টি ছিল নিছক সাজানো নাটক। কারণ বিমল টাকা সংগ্রহ করলে আসল মিশন শুরু করা হবে বলে নীলনকশা করে দুর্বৃত্তরা। সেভাবেই ওইদিন সকালে বিমলের স্ত্রী, মেয়ে ও গাড়ি চালককে গুলি করে ছেলেকে অপহরণ করে সন্ত্রাসী গ্রুপটি। পুরো দুইদিন কোন যোগাযোগ না করে মঙ্গলবার সকালে প্রথম বিমলকে ফোন করে অপহরণকারীরা। দাবি করে ২ কোটি টাকা। দিনব্যাপী চলে দেনদরবার। শেষ পর্যন্ত রফা হয় ‘৫০ লাখ টাকায়’। আর জমি নিয়ে যে ঝামেলা তা কিন্তু থেকেই গেছে। এর জন্য ঠিক করা টাকা কিন্তু বিমলকে দিতেই হবে। অপহরণকারীদের কথামতো মঙ্গলবার রাতেই ৫০ লাখ টাকা নিয়ে শিশুটির বাবা প্রথমে একটি সিএনজি অটোরিক্সায় আমিনবাজার পার হয়ে তুরাগ সেতুর কাছে যান। সেখান থেকে তাঁকে মুগলা বাজারের আওয়াল মার্কেটের কাছে যেতে বলা হয়। ওই সময় তিনি একটি ব্যাগে করে টাকা নিয়ে একটি কাঁচা রাস্তায় ঢুকে পড়েন। এরপর রাস্তায় মোবাইল ফোন সেটের আলো ফেলে কিছুদূর যাওয়ার পর দু’জন সন্ত্রাসী এসে পেছন থেকে মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে টাকাভর্তি ব্যাগটি নিয়ে যায়। তখন রাত ১১টা ৪০ মিনিট। এর ২০ মিনিট পরে বিমলকে ফোন করে বছিলা সেতু পার হয়ে আঁটি নয়াবাজারে যেতে বলে অপহরণকারীরা। আরো ২০ মিনিট পর সেখানেই রাত ১২টা ২০ মিনিটে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেল পরাগ মণ্ডলকে।

পরিবারে খুশির বন্যা

এদিকে পরাগকে ফিরে পেয়ে তাদের বাড়িতে চলছে খুশির বন্যা। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পশ্চিমপাড়া কালীবাড়ি এলাকায় পরাগদের বাড়িতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভিড়। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বিমল মণ্ডল বলেন, ‘যেভাবে হোক, আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি। এটা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ এ জন্য তিনি পুলিশ, র্যাবসহ সব প্রশাসন ও মিডিয়ার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরাগের ঠাকুর মা (দাদী) সাবিত্রী মণ্ডল বলেন, ‘টাকা গেছে যাক, এতে কোন দুঃখ নেই, বড় কথা হলো, নাতি ফিরে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা আমার নাতিকে টাকার জন্য অপহরণ করেছিল। অপহরণ না করে আমাদের কাছে টাকা চাইত, আমরা লুকিয়ে দিয়ে আসতাম।’

মা-ছেলে স্কয়ার হাসপাতালে

মঙ্গলবার রাতে পরাগকে উদ্ধারের পর রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের তত্ত্বাবধানে তার চিকিত্সা চলছে। গতকাল সন্ধ্যায় পরাগের মা লিপি মণ্ডলকে বক্ষব্যাধি হাসপাতাল থেকে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। মায়ের কাছে তুলে দেয়া হয় তার আদরের নিধিকে।

পরাগের তত্ত্বাবধানকারী শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডা. মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, পরাগকে ঘুমের ইনজেকশন দেয়া হয়েছিল। গতকাল সে স্বাভাবিক আচারণ করতে শুরু করেছে। যদিও না খেয়ে তিন দিনে সে দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার হার্ট ও কিডনিতে নতুন করে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তবে আশঙ্কাজনক কিছু না। শিগগিরই সুস্থ হয়ে উঠবে সে।

নাজিম, আমিরকে ধরতে অভিযান, মামুনকে থানায় সোপর্দ

অপহরণ মিশনে নেতৃত্ব দেয়া নাজিম, আমির আর নিরঞ্জন নামে তিন সন্ত্রাসীকে ধরতে গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাবের অভিযান চলছে। র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল বলেন, সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার ও টাকা উদ্ধারের জন্য র্যাবের অভিযান চলছে। অন্যদিকে পুলিশের ঢাকা বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক নূরুজ্জামান বলেন, কোন টাকা দিয়ে নয়, অভিযানেই পরাগকে উদ্ধার করা হয়েছে। এখন অপরাধীদের গ্রেফতারই তাদের আসল কাজ। তিনি বলেন, ‘মুক্তিপণ দিয়ে অপহূতকে উদ্ধার করা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবসা নয়। দেশে তাহলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এত সদস্য আছে কি করতে?’

এদিকে মামুন নামে এক সন্ত্রাসীকে ডিবি পুলিশ কেরানীগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করেছে। মামুন পুলিশকে জানিয়েছে, এই অপহরণের সঙ্গে ৭ জন সরাসরি সম্পৃক্ত। এদের একজন ছাত্র ও ৬ জন পেশাদার সন্ত্রাসী। এদের বাড়ি পুরনো ঢাকা, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ি ও ধলপুরে। সন্ত্রাসীদের তিনজনকে দেড় মাস আগে সরকার দলীয় এক নেতা চার লাখ টাকা খরচ করে কারাগার থেকে জামিনে ছাড়িয়ে আনেন। এদের একজন আমির অন্যতম শীর্ষ সন্ত্রাসী।

মামুন স্বীকার করেছে, কালাচাঁন নামে ব্যক্তি বিমল মণ্ডলের পরিবারের সদস্যদের সব তথ্য সন্ত্রাসীদের কাছে সরবরাহ করেছে। ঘটনার পর থেকে কালাচাঁন ও স্থানীয় যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম জুয়েল মোল্লা পলাতক রয়েছেন। তাদেরও খুঁজছে র্যাব ও পুলিশ।

প্রসঙ্গত, গত রবিবার সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে মা লিপি মণ্ডল, বোন পিনাকি মণ্ডল ও গাড়িচালক নজরুল ইসলামকে গুলি করে শুভাঢ্যা বাংলাবাজার হিড ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্র পরাগকে (৬) তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। পরাগের বোন পিনাকি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে। গাড়িচালক নজরুল মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।

অপহরণ মামলায় প্রথম গ্রেফতার মামুন

পরাগ অপহরন মামলায় কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশ মোহাম্মদ মামুন মিয়াকে গতকাল রাতে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পুর্ব পাড়ার মৃত সুলতান মিয়ার ছেলে মামুন মিয়া। দক্ষিন কেরানীগঞ্জের ডিউটি অফিসার এসআই আব্দুল হাকিম জানান, গতকাল বিকালে তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। ২০০১ সালে তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা রয়েছে। পরাগ অপহরণের ঘটনায় মামুনই প্রথম গ্রেফতারহলেন। আজ তাকে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হবে।

পুলিশ জানায়, পরাগ অপহরনকারী যার নামের আধ্যক্ষর‘ এ’। ‘এ’ সুই মেশিন ব্যবসায়ি। তার ব্যবসায়ি পার্টনার মামুন। তিনি বলেন, মামুনকে ব্যবহার করেই উদ্ধার করা হয় পরাগকে।

সূত্র জানায়, ঘটনার পরের দিনই ঢাকা জেলা পুলিশ ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ যৌথভাবে অভিযান শুরু করে। এ জন্য একটি সার্বক্ষনিক কনন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে পুলিশ মামুনকে আটক করে। পরে মামুনের দেওয়া তথ্য মতে যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম জুয়েলকে না পেয়ে তারা স্ত্রী সন্তান ও কয়েকজন আত্মীয়কে আটক করে । এরপর মামুনের মাধ্যমে অপরহরকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে পুলিশ। এ অবস্থায় মধ্যে অপরনকারীরা পরাগকে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে নমনীয় হয়। পুলিশ জানায়, মামুনের কথা মতো অপহরনকারীরা মোবাইল ফোনে বুধবার সন্ধ্যায় পরাগের বাবা বিমাণ মন্ডলের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

পুলিশ সুপার (ঢাকা) হাবিবুর রহমান বলেন, পরাগ উদ্ধারের প্রথম পর্ব শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্বে জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু। জড়িতদের শনাক্ত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

No comments:

Post a Comment