টেস্টের মেজাজটা এত দিনে ধরতে পেরেছেন বোলাররা
বাংলাদেশ দলের ব্যাটিংকেন্দ্রিক চিন্তায় বোলাররা, বিশেষ করে পেসাররা বরাবরই অবহেলিত। ইদানীং যেন আরো বেশি। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজেই যেমন টানা দুই টেস্টে তাঁদের প্রতিকূল উইকেটে বোলিং করার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। গতি আর বুদ্ধির মিশেলে সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণও করা রুবেল হোসেন প্রশ্নটা শুনে নিরুপায়ের হাসি হাসলেন প্রথমে। 'এমন উইকেটে বোলিং করতে কেমন লাগে?'- এ প্রশ্নের জবাবে আরো বেশি অনন্যোপায় মনে হলো ইনজুরি কাটিয়ে চলতি সিরিজ দিয়েই এক বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা এ পেসারকে, 'আমি যেহেতু বোলার, কাজেই অবশ্যই চাইব আমাদের বোলারদের জন্য যেন উইকেটে একটু সহায়তা থাকে। কিন্তু আমাদের তো দলের কথা চিন্তা করেই সব সিদ্ধান্ত হয়।'
কে না জানেন যে দ্বিপক্ষীয় সিরিজে স্বাগতিক দলের মনমতো উইকেট তৈরি করে নেওয়ার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশও কখনো সে সুযোগটা হেলায় হারায়নি। এবার অবশ্য স্পিন-সহায়ক উইকেট তৈরির চিন্তা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। কারণ ক্যারিবীয় দলে সুনীল নারিনের উপস্থিতি এবং একই সঙ্গে কিছুদিন আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজ হাই পারফরম্যান্স দলের বাংলাদেশ সফর থেকে সাফল্য নিয়ে ফেরা বাঁহাতি স্পিনার বীরাস্বামী পেরমল। হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কায় এবার নতুন চিন্তার ফল দেখেছেন ঢাকায় সিরিজের প্রথম টেস্টেই। সেখানে নিজেদের প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৫৫৬ রান করায় মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের শ্রীলঙ্কান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভাকে এমনকি খুলনায় উড়িয়ে আনার প্রস্তাবও করেছিলেন কেউ কেউ। ব্যাটসম্যানরা যেহেতু রান করছেন কাজেই...।
কিন্তু ব্যাটসম্যানদের নিজেদের ভুলে সেখানেই এখন বিপাকে বাংলাদেশ। শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের উইকেটে ক্যারিবীয়দের রান-পাহাড় আরো উঁচু হওয়ার অপেক্ষা। সেখানে সারা দিন ক্লান্তিহীন বোলিং করে গেছেন বোলাররা। দুই পেসার রুবেল ও আবুল হাসান মারলন স্যামুয়েলসদের নানাভাবে ভুলের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা করেছেন। কখনো কখনো অল্পের জন্য সাফল্যের মুখ দেখেননি। ক্যারিয়ারের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করা স্যামুয়েলস তো পরাস্ত হয়েছেন বেশ কয়েকবারই। ২৮ ওভার বোলিং করে আটটি মেডেনসহ ৭৫ রানে দুই উইকেট নেওয়া রুবেল যেমন বলছিলেন, 'এ উইকেটে বোলিংয়ে বৈচিত্র্য না আনলে আসলে ফল পাওয়া কঠিন। আবুল হাসান স্লোয়ার দিয়ে খুব ভালো চেষ্টা করেছে। বাউন্সারের পাশাপাশি আমিও স্লোয়ারে ওদের ভুল করানোর চেষ্টা করে গেছি।'
স্পিনাররাও চেষ্টা করে গেছেন সাধ্যমতো। ফলের খাতায় নম্বর অবশ্য খুব বেশি যোগ করতে পারেননি। তাতেও হাল না ছাড়ার মানসিকতার প্রকাশকেও প্রাপ্তি হিসেবে ধরা যায়। এ সিরিজ শুরুর আগে অধিনায়ক মুশফিকুর রহিমও এ জায়গাটায় উন্নতির লক্ষ্যের কথা বলেছিলেন। প্রতিপক্ষ রান-পাহাড় তুলে ফেলার পর বোলারদের শরীরী ভাষায় যেন সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে না দেওয়াটা ফুটে ওঠে। সেটা ফুটিয়ে তুলতে পারছেন বলেই দাবি করলেন রুবেলও, 'একঘেয়ে লাগে না। বল করাই তো আমার কাজ। বোলিংটাই করতে হবে।' করতে গিয়ে এখন শুধু তিনি একা নন, অন্য বোলাররাও উদ্যোগী বলে জানালেন, 'আমরা বোলাররা এখন টেস্ট ক্রিকেটের মেজাজটা অনেক বেশি ধরতে পারছি। এমন নয় যে শুধু আমাদের বিপক্ষেই এত এত রান হচ্ছে। অন্যান্য জায়গাতেও তো হয়। তাই বলে চেষ্টা থামিয়ে দিলে হয় না। এ জন্য আজ (গতকাল) সারা দিনে আমরা কিন্তু কম চেষ্টা করিনি।'
লাফিয়ে ওঠা বলে যেমন অপ্রস্তুত করে দিয়েছিলেন স্যামুয়েলসকে। আর তাতে ক্যারিয়ারে প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি করা ওই জ্যামাইকানের ট্রিপল সেঞ্চুরির স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছেন। কাল সারা দিনে ওই একটাই সাফল্য পাওয়া রুবেলের বাউন্সার দেওয়ায়ও ছিল চিন্তার ছাপ, 'এই উইকেটে বাউন্সার দেওয়াও কঠিন। সব সময় বল ওঠে না। এর একটা সুবিধাও আছে। যেসব উইকেটে সহজে বাউন্সার দেওয়া যায়, সেখানে ব্যাটসম্যানদের কাজটাও সহজ। আরামে মাথা নামিয়ে ছেড়ে দেয়। কিন্তু এ উইকেটে বল সব সময় ওঠে না বলে ব্যাটসম্যানও বোঝার ভুলে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে সুযোগ থাকে।' বোলিংয়ের গতি নিয়ে তাঁর কথা, 'আপনারা জানেন, এটা ব্যাটিং উইকেট। আমি তাই চেষ্টা করেছি ভালো জায়গায় বল করতে এবং ব্যাটসম্যানকে পরাস্ত করতে। আর ইনজুরি থেকে যেহেতু এক বছর পর ফিরেছি, চেয়েছি আস্তে আস্তে আমার গতিটা বাড়াতে। আজ সকাল থেকে আরেকটু ছন্দ পাওয়াতে গতিটা আরো বেড়েছে।' নিষ্প্রাণ উইকেটে বহুবার ব্যাটসম্যানকে পরাস্ত করেও সাফল্য না পাওয়ার হতাশাও অবশ্য রুবেলের সঙ্গী হয়ে থেকেছে, 'যখন দেখছি ব্যাটসম্যান বিট হচ্ছে কিন্তু উইকেট পাচ্ছি না, তখন অসহায়ই লাগে।'
নিঃস্ব হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ব্যাটিং উইকেটে বোলিং করতে নামা রুবেলরা তবুও হাল ছাড়েন না। ক্যারিবীয়দের রান-পাহাড়ও যে প্রাপ্তিকে আড়াল করতে পারছে না!
No comments:
Post a Comment