ওরা গুণ্ডা আঙ্কেল পিস্তলের ভয় দেখিয়েছিল
ওরা গুণ্ডা আঙ্কেল। পিস্তল দেখিয়ে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছিল। ওদের মোটরসাইকেলে না গেলে মেরে ফেলবে বলেছিল। তখন ভয় পেয়ে আব্বুকে ডাক দেই, সঙ্গে সঙ্গে পিস্তল দিয়ে মাথায় আঘাত করে।’ গতকাল দুপুরে ৬ বছরের ক্ষুদে শিক্ষার্থী পরাগ মণ্ডল এভাবেই তার অপহরণ ঘটনার বর্ণনা করেছে। এদিকে পরাগ অপহরণের নাটের গুরু স্থানীয় যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম ওরফে জুয়েল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল। গতকাল দুপুরে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পূর্ব পাড়ার নিজ বাড়ির সামনে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে রাজধানীর মিন্টো রোডস্থ ডিবি পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। পরাগ বলে, আমাকে মোটরসাইকেলে তুলে নেয়ার পর শুধু ব্যথা পেয়েছি। এরপর কিছু মনে নেই। কখনও কখনও মনে হয়েছে আমি একটি খাটের ওপর শুয়ে আছি। মাঝে-মধ্যে কারা যেন জুস খাইয়েছে। তাদের চোখে দেখিনি। ঘুম ভেঙে গেলে নড়াচড়া করতে পারিনি। হাত ও পা নড়াচড়া করতে পারিনি। কষ্ট পেলেও কাউকে ডাকতে পারিনি। আব্বু ও আম্মুকে ডাকলেও শুনতে পায়নি। আঠার মতো কিছু দিয়ে মুখ বন্ধ করেছিল। পরাগের দাদি সাবিত্রী মণ্ডল বলেন, আমার নাতি বয়সে ছোট হলেও সাহসী। গুণ্ডারা ইনজেকশন পুশ না করলে নিতে পারতো না। ও কিলঘুষি দিয়েই মোটরসাইকেল চালককে ফেলে দিতে পারতো। কিন্তু ওরা মোটরসাইকেলে চড়িয়েই পিস্তল দিয়ে কপালে জোরে আঘাত করে। পুশ করে চেতনানাশক ইনজেকশন। পরে অপহরণস্থল থেকে একটি খালি সিরিঞ্জ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তা পুলিশের কাছে দেয়া হয়। তিনি বলেন, ওই ইনজেকশন দেয়ার কিছুক্ষণ পরেই আমার নাতি অচেতন হয়ে পড়ে। তিনি যখন কথা বলছিলেন তখন পরাগ কেরানীগঞ্জের নিজ বাড়ির আঙিনায় সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে ছোটাছুটি করছিল। দূর-দূরান্ত থেকে আসা নিকটজনরা নিবিড়ভাবে দেখছিল তার দুরন্তপনা। বারান্দায় দাঁড়িয়ে পরম মমতা জড়ানো নিষ্পলক দৃষ্টিপানে অবুঝ ছেলের দুষ্টুমি উপভোগ করছিলেন মাতা লিপি রানী মণ্ডল। গুলিবিদ্ধ বোন পিনাকী মণ্ডল ব্যান্ডেজ জড়ানো পা নিয়ে ভাইয়ের পিছু পিছু হাঁটছিল। দিদিমা সাবিত্রী মণ্ডল বাড়ির উঠোনে জটলা পাকানো বিভিন্ন বয়সী মহিলাদের নানা ধরনের মানতের কথা শুনছিলেন। কেউ বলছিলেন, পরাগকে উদ্ধারের জন্য মায়ের কাছে মানত করে কথা দিয়েছিলাম। উদ্ধার হলে ‘যা চাইবি মা তাই দেবো’। আরেক বৃদ্ধা বলছিলেন, তোর নাতির জন্য ঠাকুরঘরে রাত কাটিয়েছি। উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত মাথা ঠুকেছি। এসব কথা শুনে পরাগের দাদি সাবিত্রী মণ্ডল বলেন, দুনিয়ার সব মানুষই আমার নাতির জন্য দোয়া করেছেন। অশ্রু বিসর্জন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশ থেকে শুরু করে সবাই মিলে আমার নাতিকে উদ্ধার করেছেন। গত ১১ই নভেম্বর স্কুলে যাওয়ার পথে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পশ্চিম শুভাঢ্যা এলাকায় প্রথম শ্রেণীর ছাত্র পরাগকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসীরা। এ সময় তার মা লিপি রানী মণ্ডল (৩৫), বোন পিনাকী মণ্ডল ও গাড়িচালক নজরুল ইসলামকে গুলি করে তারা। ওই রাতেই পরাগের দাদি সাবিত্রী মণ্ডল বাদী হয়ে অপহরণ মামলা করেন। অপহরণের তিনদিন পর আঁটি বাজারে নয়াবাজার এলাকার রাস্তার পাশ থেকে উদ্ধার হয় প্রায় অচেতন পরাগ। চিকিৎসা শেষে বুধবার তাকে হাসপাতাল থেকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরাগকে উদ্ধারের পরদিন এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মামুন নামে একজনকে মুন্সীগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আর র্যাব একই দিনে জাহিদুল হাসান, মোহাম্মদ আলী ওরফে রিফাত, কালা চান, আলফাজ, রিজভী আহমেদ অনিক ও আবুল কাশেম নামে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে জাহিদুল, কালা চান ও আলী ওরফে রিফাত অপহরণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দিও দিয়েছেন। তাদের তিনজনের বক্তব্যেই অপহরণের পরিকল্পনার ‘মূল হোতা’ হিসাবে আমিরের নাম এসেছে। গত ২১শে নভেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ফেরি ঘাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তার মোটরসাইকেল চালক আলামিন ও সহযোগী শাহিনকে। তাদের দেয়া তথ্য মোতাবেক কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের সাবেক যুবলীগ নেতা আমিনুল ইসলাম ওরফে জুয়েল মোল্লাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল। সূত্র জানায়, হাই কোর্টের একটি আদেশ জারির পরপরই পূর্ব শুভাঢ্যার নিজের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে জুয়েলকে আটক করা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান বলেন, হাইকোর্টের আদেশ মোতাবেক জুয়েল মোল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। গত ১১ই নভেম্বর ব্যবসায়ী বিমল মণ্ডলের ছেলে অপহরণের পর এতে জুয়েলের জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। তবে সংবাদ সম্মেলন করে ওই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন শুভাঢ্যা ইউনিয়ন যুবলীগের এই সাবেক সভাপতি।
জাহাজের মতো মোটরসাইকেলে পরাগকে নিয়ে যায়: পরাগের ঠিক দুই বছরের বড় বোন পিয়ালী মণ্ডল বলে, গুণ্ডারা সিনেমার জাহাজের মতো মোটরসাইকেল দিয়ে আমার ভাইকে তুলে নিয়েছিল। পরাগ যেতে চায়নি। বারবার বলেছে, আমি আমাদের গাড়িতে স্কুলে যাবো। তোমাদের সঙ্গে যাবো না। এ সময় ওরা পিস্তল বের করে গুলি করতে থাকে। আমি ভয় পেয়ে দৌড়ে বাড়িতে চলে আসি। পিয়ালীর দাদি সাবিত্রী মণ্ডল বলেন, পরাগ দৌড়ে বাড়ি পর্যন্ত আসতে পারেনি। তার আগেই অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। তবে তার সবকিছুই মনে আছে। কয়টি মোটরসাইকেল এসেছিল, দেখতে কেমন ছিল- সবই বলেছে আমাদের কাছে। এলাকাবাসী বলেন, অপহরণকারীরা পরাগকে তুলে নিয়ে স্থানীয় যুবলীগ নেতা জুয়েল মোল্লার বাড়ি সংলগ্ন ব্রিজের নিচের রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহায়তা ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ ওই সরু রাস্তা দিয়ে অপহরণকারীদের পক্ষে পালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন তারা। সূত্র জানায়, জমি-জমা নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরেই শীর্ষ সন্ত্রাসী আমিরের সহায়তায় এই অপহরণ ঘটিয়েছে ওই যুবলীগ নেতা। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গতকাল পর্যন্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হচ্ছে- স্থানীয় যুবলীগ নেতা জুয়েল মোল্লা, মামুন, আমিরের মোটরসাইকেল চালক আলামিন, শাহিন, আলফাজ, মোহাম্মদ আলী ওরফে রিফাত. কালাচাঁন, রিজভী আহমেদ অনিক, আমিরের ভগ্নিপতি আবুল কাশেম ও জাহিদুল হাসান। এখন পর্যন্ত আমিরের সন্ধান পায়নি পুলিশ ও গোয়েন্দারা। পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পলাতক আমিরের সঙ্গে আটক যুবলীগ নেতার ঘনিষ্ঠতার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া আমিরের মোটরসাইকেল চালক আলামিন ও সহযোগী শাহিনের জিজ্ঞাসাবাদের সূত্র ধরে এই অপহরণের নাটের গুরু হিসেবে তার নাম জানতে পারে তদন্ত কর্মকর্তা। এরপরই তাকে গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেয় পুলিশ। এখন আমির গ্রেপ্তার হলেই পরাগ অপহরণ রহস্য উদঘাটন হবে বলে জানান তিনি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ওসি (তদন্ত) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, অপহরণের আসল মোটিভ উদ্ধার করতেই জুয়েল মোল্লাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঢাকা জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল আটক করেছে। তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেলে গ্রেপ্তার করা হবে।
No comments:
Post a Comment