ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণবিবর নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনার কোনো শেষ নেই। এমনই রহস্যময় এই কৃষ্ণবিবর। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্ব থেকে দেখা যায়, কৃষ্ণবিবর বা ব্ল্যাকহোল হচ্ছে মহাকাশের এমন একটি জায়গা যেখানে পদার্থের ঘনত্ব খুবই বেশি এবং মাধ্যাকর্ষণ বল এতই বেশি যে কোনোকিছুই; এমনকি আলোও, এর আওতা থেকে পালাতে পারে না। এমনই এর শক্তি যে আলোর মতো শক্তিও এর কাছে তুচ্ছ। লিখেছেন প্রাঞ্জল সেলিম
ব্ল্যাকহোল থেকে কোনো কিছুই ফিরে আসে না। একবার ঢুকলে তার আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তবে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে বলা হয়, ব্ল্যাকহোল দেখতে পাওয়া যায় না। তবে প্রমাণের মাধ্যমে এর অস্তিত্ত্ব বুঝা যায়। এর প্রচণ্ড রকম ভরের কারণে চারপাশের পদার্থগুলোকে শুষে নেওয়ার ফলে এর চারপাশে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়। তিন দশক ধরে বিভিন্ন তত্ত্ব দেওয়ার পরে আর বিভিন্নভাবে খোঁজাখুঁজির পরে সবচাইতে সন্দেহপ্রবণ জ্যোতির্পদার্থবিদসহ সবাই ব্ল্যাকহোলের অস্তিত্ত্ব নিশ্চিত করেছে। বিজ্ঞানীরা এমনও প্রমাণ পাচ্ছেন যে প্রায় সব গ্যালাক্সির কেন্দ্রভাগেই প্রচণ্ড ভরসম্পন্ন এই কৃষ্ণবিবরগুলো রয়েছে। আর এই কৃষ্ণবিবরগুলোর ভর তাদের গ্যালাক্সিগুলোর ভরের আনুপাতিক। হাবল টেলিস্কোপ এবং হাওয়াইয়ের গ্রাউন্ড বেজড টেলিস্কোপগুলোর পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ব্ল্যাকহোল এত বেশি সংখ্যায় থাকাটা ডা. রিচস্টোনের তত্ত্বাবধানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দলের কাছে এখনো বড় একটা রহস্য। আরেকটা বড় রহস্য হচ্ছে গ্যালাক্সির ভরের সঙ্গে ব্ল্যাকহোলের ভরের আনুপাতিক থাকাটা। তবে এর ব্যাখ্যা যাই হোক না কেন, গ্যালাক্সির গঠন এবং বিবর্তন সম্পর্কে সেটা আমাদের অনেক কিছু জানতে সহায়তা করবে। ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে জ্যোতির্পদার্থবিদরা যতই জানতে পারছেন ততই তারা মহাবিশ্বের ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে পারছেন। সায়েন্টিফিক আমেরিকান লাইব্রেরি থেকে প্রকাশিত ‘গ্র্যাভিটি’স ফ্যাটাল অ্যাট্রাকশন’ বইটিতে ড. মিশেল বেগেলম্যান (ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডো) এবং স্যার মার্টিন রিস (ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ এবং রয়্যাল অব ইংল্যান্ডের জ্যোতির্বিজ্ঞানী) ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে লিখেন, ‘যেকোনো বলের চেয়ে মাধ্যাকর্ষণ বল যে শক্তিশালী তা ব্ল্যাকহোল প্রমাণ করে।’ তারা এও বলেন যে, সত্যিকারভাবে ব্ল্যাকহোলকে বুঝতে পারলে মহাবিশ্বের সৃষ্টিটাও বুঝা সহজ হবে। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন যে দু’ ধরনের ব্ল্যাকহোল রয়েছে; স্টেলার এবং গ্যালাকটিক। স্টেলারগুলো বেশ ছোটখাটো হয়ে থাকে। যখন সূর্যের চাইতে কয়েক গুণ ভরসম্পন্ন তারাগুলোর পারমাণবিক জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তখন এগুলো ঘণীভূত হয়ে মাত্র কয়েক মাইল ব্যাসে এসে পৌঁছায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এগুলো নিউট্রন নক্ষত্রে পরিণত হয়। কিন্তু সবচাইতে বেশি ভরসম্পন্ন তারাগুলো ঘণীভূত হয়ে কৃষ্ণবিবরে পরিণত হয়। এদের বেশিরভাগগুলো মহাকাশের যে অঞ্চলে নক্ষত্ররা অবস্থান করে সেখানেই থাকে। তবে তাদের চিহ্নিত করা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু কিছু কিছু স্টেলার ব্ল্যাকহোলকে চিহ্নিত করা যায়, কারণ সেগুলো বাইনারি সিস্টেম বা দ্বৈত নক্ষত্র হিসেবে থাকে। যার ফলে এই ব্ল্যাকহোলগুলোর সঙ্গী হিসেবে একটি সাধারণ নক্ষত্র থাকে। আর ব্ল্যাকহোলটি সেই সঙ্গী নক্ষত্রকে গিলতে শুরু করে। তবে গ্যালাক্সির কেন্দ্রভাগে যেসব ব্ল্যাকহোল রয়েছে, সেগুলো জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সম্ভবত মহাজাগতিক ইতিহাসের প্রায় ৯০ ভাগ সময় ধরে এগুলো রয়েছে। গ্যালাক্সির কেন্দ্রভাগে বিশাল পরিমাণে ভর জমা রয়েছে। সৌরজগতের মতো স্বল্প পরিসরে প্রায় তিন বিলিয়ন সূর্যের সমান ভর জমা থাকে। এখন পর্যন্ত এটি কেন ঘটছে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। অর্থাত্ এই ভরের জন্য যে ব্ল্যাকহোল দায়ী, তা বলাই যায়।
১৯৯৪ সালে হাবল টেলিস্কোপ থেকে তোলা ছবি থেকে এ ধরনের অতিভরসম্পন্ন ব্ল্যাকহোলের প্রমাণ পাওয়া গেছে এম৮৭ নামের বিশাল গ্যালাক্সিতে। ব্ল্যাকহোলটির চারপাশের প্রায় ৫০০ আলোক-বর্ষ পরিমাণ জায়গাজুড়ে ঘূর্ণায়মান গ্যাসের স্রোত দেখা গেছে। হাবল টেলিস্কোপ থেকে এইসব গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণের সময় দেখা যায় এদের কেন্দ্রের কাছাকাছি তারাগুলোর গতি ক্রমশই বাড়ছে। আর এটা সম্ভব হতে পারে একমাত্র ব্ল্যাকহোলের প্রচণ্ড রকম ভরের কারণেই। এইসব তথ্য এবং অন্যান্য আবিষ্কার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একটি কম্পিউটার মডেল তৈরি করেন যাতে এই গতিবেগ দেখে ব্ল্যাকহোলের উপস্থিতি জানা যায়। এই মডেল ব্যবহার করে তারা কাছাকাছি আরও ১৫টি গ্যালাক্সির ওপর পর্যবেক্ষণ চালান। এতে ১৪টিরই আচরণে বুঝা যায় যে, এদের কেন্দ্রভাগে ব্ল্যাকহোল রয়েছে।
No comments:
Post a Comment