Pages

Saturday, November 17, 2012

লিভারের প্রদাহ ও ভাইরাল হেপাটাইটিস

 লিভারের প্রদাহ ও ভাইরাল হেপাটাইটিস 

আমাদের দেশে লিভারের নানাবিধ রোগ রয়েছে। সব সময় যে রোগটি ঘরে ঘরে দেখা যায় তা জনমুখে জণ্ডিস নামে পরিচিত। আসলে জণ্ডিস কোন রোগ নয়। এটা নানাবিধ কারণে লিভারের প্রদাহের লক্ষণ মাত্র। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কারণে লিভারের প্রদাহ হয়ে থাকে। যে কোন ভাইরাস দ্ব্বারা ইনফেকশন হয়ে লিভারের প্রদাহ হতে পারে। তন্মধ্যে কতগুলো ভাইরাস আছে মানব দেহে ঢুকেই যাদের লিভার কোষে বাসা বাঁধার শক্তি রয়েছে। এ জাতীয় ভাইরাসগুলোকে হেপাটাইটিস ভাইরাস হিসেবে নাম করণ করা হয়েছে। এই ভাইরাসগুলোকে একটি পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করা হয়। তাদের নাম যথাক্রমে হেপাটাইটিস ‘এ’, হেপাটাইটিস ‘বি’, হেপাটাইটিস ‘সি’, হেপাটাইসিস ‘ডি’ ও হেপাটাইটিস ‘ই’ ভাইরাস। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই ভাইরাসগুলো মানবদেহের লিভারকে আক্রান্ত করে। তাছাড়াও ডেঙ্গু ভাইরাস, ইয়েলো ফিবার ভাইরাস কখনো কখনো লিভারকে আক্রান্ত করতে পারে। ভাইরাস ছাড়া অন্যান্য কারণেও লিভারের প্রদাহের সৃষ্টি হতে পারে। যেমন- ওষুধের বিষক্রিয়া, আয়রণ কপার মেটাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সমস্যা, এইচ আই ভি ইনফেকশন, মদ্যপানের অভ্যাস এবং কারণ জানা নেই এমন রোগ যেমন, অটোইমিউন হেপাটাইটিস। ব্যাক্টেরিয়া জনিত পায়োজেনিক লিভার এবসেস, হেপাটিক এমেবিয়াসিস,  হাইডাটিড ডিজিজ অব লিভার, একটিনোমাইকোসিস, টিউবারকালোসিস, সিফিলিস, লেপটোস্পাইরোসিস, রিকেটসিয়াল ইনফেকশন, সিস্টোসোমিয়াসিস, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, লিভার ফ্লুক্স ইত্যাদি দ্ব্বারাও লিভার আক্রান্ত
হতে পারে।
তবে আমাদের দেশে ভাইরাল হেপাটাইটিস, এমেবিক লিভার এবসেস ও হাইডাটিড ডিজিজ লিভারের রোগের অন্যতম কারণ। এ আলোচনায় ভাইরাল হেপাটাইটিস সম্পর্কে কিছু তথ্য পেশ করব।
আমরা জানি লিভার শরীরের জন্য একটি অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ। হেপাটাইটিস ভাইরাসের কারণে লিভারে প্রদাহ হলে আমরা তাকে হেপাটাইটিস রোগ বলি। হেপাটাইটিস রোগ স্বল্পমেয়াদী (Acute) বা দীর্ঘমেয়াদী (Chronic) দু’ ভাবেই হতে পারে।
হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস স্বল্পমেয়াদী হেপাটাইটিস রোগের অন্যতম কারণ। হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’  ভাইরাস স্বল্পমেয়াদী  ও দীর্ঘমেয়াদী উভয় প্রকার হেপাটাইটিস রোগ সৃষ্টি করতে পারে। হেপাটাইটিস ‘এ’ এবং ‘ই’ ভাইরাস দুষিত পানীয় ও খাবারের মাধ্যমে ছড়ায়। হেপাটাইটিস ‘বি’, ‘সি’ ও ‘ডি’ ভাইরাস দূষিত রক্ত, সিরিঞ্জ, যৌন মিলন ইত্যাদির মাধ্যমে ছড়ায়। আমাদের দেশে হেপাটাইটিস ‘ই’ ও ‘এ’ ভাইরাসের কারণে স্বল্পমেয়াদী হেপাটাইটিসের প্রাদুর্ভাব বিশেষভাবে লক্ষ্য  করা যায় । আমাদের দেশের কর্মজীবী ও সাধারণ জনগন বাইরের প্রস্তুত করা খাবার গ্রহণে অভ্যস্থ বিধায় ‘ই’ ও ‘এ’ ভাইরাসটি সহজে সংক্রমিত হয়।
দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস সৃষ্টিকারী ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশী। পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের প্রতি ১২ জনে ১ জন হেপাটাইটিস ‘বি’ বা ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত আছে। সে হিসেবে বিশ্বের প্রায় ৫২ কোটি লোক এই দুইটি ভাইরাসে আক্রান্ত। দীর্ঘমেয়াদী হেপাটাইটিস রোগের জটিলতা, যেমন- ক্রনিক হেপাটাইটিস, লিভার সিরোসিস, লিভার ফেইলিউর, লিভার ক্যান্সার দ্ব্বারা আক্রান্ত হয়ে রোগী মৃত্যু মুখে পতিত হয়। স্বল্প মেয়াদী হেপাটাইটিস আক্রান্ত রোগী সঠিক চিকিত্সার মাধ্যমে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আরোগ্যলাভ করে কিন্তু কখনো কখনো লিভার ফেইলিওর হয়ে মারা যেতে পারে।
এই পর্যায়ে দীর্ঘ মেয়াদী হেপাটাইটিস সম্পর্কে আলোচনা করব। দীর্ঘ মেয়াদী হেপাটাইটিস এর অন্যতম কারণ হচ্ছে হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাস।
হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস
বি ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের উপর ভিত্তি করে বিশ্বকে উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন আকান্ত এলাকা হিসেবে ভাগ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ মধ্যম আক্রান্ত এলাকা। বাংলাদেশের শতকরা ৪.৪ ভাগ মানুষ এই ভাইরাস বহন করছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিদেশগামী দক্ষ/অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ৪.৪ থেকে ৭.৫ ভাগ, গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে ৩.৫ ভাগ, বস্তিবাসী লোকদের মধ্যে ৩.৮ ভাগ, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪.৮ ভাগ, স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে ২.৩ ভাগ, স্বেচ্ছা রক্তদানকারীদের মধ্যে ২.৪ ভাগ লোক,  হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।
স্বল্পমেয়াদী হেপাটাইটিস রোগীদের শতকরা ১৯.০-৩৫.০ ভাগ, দীর্ঘ মেয়াদী লিভার রোগীদের শতকরা ৩৩.৩ - ৪০.৫ ভাগ এবং লিভার ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে গড়ে শতকরা ৪৫.৮ ভাগ  হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে।
আমাদের দেশে হেপাটাইটিস ‘বি’ আক্রান্ত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে শতকরা ২০.৯ ভাগ, পেশাদার রক্ত দাতাদের মধ্যে শতকরা ১৮.২-২৯.০ ভাগ, শিরাপথে ড্রাগাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৬.২-১২.০ ভাগ, অন্যান্য ড্রাগাসক্তদের মধ্যে শতকরা ৪.৪ ভাগ, ট্রাক ড্রাইভারদের মধ্যে ৫.৯ ভাগ এবং পতিতাদের মধ্যে ৯.৭ ভাগ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত।
কিভাবে ছড়ায়
রক্ত এবং রক্তজাত পদার্থ মূলত এই ভাইরাসের বাহক। রক্ত রস, লালা এবং বীর্যের  মাধ্যমে এই ভাইরাস এক দেহ থেকে অন্য দেহে সংক্রমিত হয়। আকুপাংচার, মুসলমানী, নাক, কান ফুঁড়ানো, সিরিঞ্জ, সূঁচ,  নাপিতের ক্ষুর ইত্যাদি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করার মাধ্যমে হেপাটাইটিস ‘বি’ ছড়ায়। হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস, এইডস এর ভাইরাস (এইচআইভি) এবং হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসের মতই যৌন মিলনের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। পুরুষ সমকামী এবং পতিতাদের মাধ্যমে সমাজে দ্রুত এই ভাইরাস বিস্তারলাভ করে।
এই রোগের প্রকৃতি নির্ভর করে কোন বয়সে একজন ব্যক্তি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হলো তার উপর। গর্ভাবস্থায় মা হেপাটাইটিস ‘বি’ এর বাহক হলে পরবর্তীতে জন্মগ্রহণকারী শিশুর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে এ ভাইরাস বিস্তার লাভ করে। অন্যদিকে বয়স্ক লোকের বেলায় এই হার মাত্র শতকরা ৫-১০ ভাগ।
হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাস
বিশ্বে মোট ১৭০ মিলিয়ন লোক হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। এশিয়া মহাদেশে আক্রান্তের হার শতকরা ০.৩ ভাগ থেকে ৪.০ ভাগ পর্যন্ত। সাধারণত রক্ত পরিসঞ্চালন, অঙ্গপ্রতিস্থাপন, ইঞ্জেকশন এবং আক্রান্ত মা থেকে শিশু ও যৌন মিলনের মাধ্যমে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস বিস্তার লাভ করে।
বাংলাদেশের পেশাদার রক্ত দাতাদের মধ্যে শতকরা ১.২ ভাগ এই ভাইরাস বহন করে। পরিসংখ্যাণে দেখা গেছে, ১ টি বিশেষায়িত হাসপাতালে কর্মরত ১.৪৪% স্বাস্থ্যকর্মী হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে আক্রান্তের হার শতকরা ০.৫  জন।
অন্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে দীর্ঘ মেয়াদী লিভার রোগীদের শতকরা ৯.৬ ভাগ, রক্ত গ্রহণের পর জন্ডিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬.৮ ভাগ এবং স্বল্প মেয়াদী জন্ডিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে ১.৭ ভাগ রোগী হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত।
হেপাটাইটিস ‘সি’ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কোন টীকা বা প্রতিষেধক এখনও আবিস্কার হয় নাই। সুতরাং, প্রতিরোধই এ রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।
ভাইরাল হেপাটাইটিস
নিয়ন্ত্রণে করণীয়
ভাইরাল হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে সর্বাপেক্ষা জরুরী হল এ রোগ সমূহের বিস্তার ও চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। এছাড়া প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা, হেপাটাইটিস ‘বি’ এর টিকা গ্রহণ, বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালণ নিশ্চিতকরণ, নিরাপদ পানীয় ও খাবার গ্রহণ এবং ডিসপোজেবল নিডল্ (সুঁই) ও সিরিঞ্জ ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে ভাইরাল হেপাটাইটিস এর প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনা সম্ভব।

No comments:

Post a Comment