আট লাখ বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় হারানোর আশংকা
ডেসটিনি পরিস্থিতি
++ কাজ না থাকায় বেকার ৪৮ লাখ পরিবেশক
++ কয়েক মাস বেতন পাচ্ছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারীরা
++ প্রশাসক নিয়োগ করা হবে আদালতের মাধ্যমেই
সঞ্চয়
হারানোর আশংকায় আছেন ডেসটিনির আট লাখ সাধারণ বিনিয়োগকারী। এছাড়া ৪৫ লাখ
পরিবেশক গত ছয় মাস ধরে কোন কাজ না থাকায় এক রকম বেকার জীবনযাপন করছেন। অর্থ
আত্নসাত্ ও টাকা পাচারের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আটক
হওয়ার পর থেকে সাধারণ বিনিযোগকারীদের মধ্যে এ আশংকা দেখা দিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মুখ থুবরে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগকৃত
অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত। অনেকেই সর্বস্ব বিনিয়োগ করে এখন
সর্বশান্ত। তিন বেলা খাবার কেনার মতো পয়সাও নেই অনেকের কাছে। ডেসটিনি
গ্রুপের একমাত্র বৈশাখী টেলিভিশনের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট সচল থাকলেও অনিয়ম ও
র্দুনীতির অভিযোগে এই গ্রুপের অন্য সব প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে
সরকার। ফলে কোন প্রকার লেনদেন করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো। গত কয়েক মাস
ধরে কোন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় এক রকম মানবেতন জীবনযাপন করছেন ডেসটিনি
গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী।
সাধারণ
বিনিয়োগকারীরা বলছেন, যদি ডেসটিনির কার্যক্রম অবৈধ হয়ে থাকে তাহলে তা
আইনের আওতায় আনা হোক। এছাড়া কারো বিরুদ্ধে অর্থ আত্নসাতের অভিযোগ প্রমানিত
হলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক কিন্তু হাজার হাজার মানুষের জীবনজীবিকা
হয় যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা সচল রাখুক সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র
জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত আদালতের মাধ্যমেই ডেসটিনিতে প্রশাসক নিয়োগ দিতে
যাচ্ছে সরকার। বিশিষ্ট আইনজীবী ও ব্যবসায়ীদের বাঁধার মুখে সরকার কোম্পানি
আইন সংশোধন করে সরাসরি প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে।
ডেসটিনি
গ্রুপের নানা অনিয়ম ও র্দুনীতি খতিয়ে দেখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত
কমিটি মোট ৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকার অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার
৪৫৪ কোটি টাকা সরাসরি তছরুপ করা হয়েছে। বাকি দুই হাজার ৩৪৬ কোটি টাকার
লেনদেন অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক।
ইতিমধ্যে টাকা পাচারের অভিযোগে মানি
লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে ডেসটিনি গ্রুপের এমডি, ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের
প্রেসিডেন্ট ও চেয়ারম্যানসহ প্রতিষ্ঠানের ২২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুটি
মামলা করেছে দুদক। এই মামলায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন ডেসটিনি গ্রুপের
এমডি রফিকুল আমিন। জামিনে রয়েছেন ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট সাবেক
সেনা প্রধান হারুন অর রশিদ, বীরপ্রতীক।
সমপ্রতি ডেসটিনি গ্রুপের
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, অফিস খোলা থাকলেও কাজকর্ম স্থবির।
অনেক কর্মচারীই ঠিকমতো অফিসে আসেন না। কয়েক মাস ধরে বেতন-ভাতা না পাওয়ায়
অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন। একই অবস্থা ডেসটিনির পরিবেশকদেরও।
রাজধানীর
কাকরাইলে স্কাউট ভবনে ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে দেখা
যায়, অফিস প্রায় খালি! নিরবতা বিরাজ করছে। এই অফিসে ৩ হাজার ৩’শ জন
কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করেন বলে জানা গেছে। কাকরাইলে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস
কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি:-এ কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে ৩’শ জনের উপরে। এছাড়া
ট্রি প্লানটেশনে কাজ করেন ১২৫ জন। এই কর্মচারীদের সবাই গত কয়েক মাস ধরে
কোন বেতন পাচ্ছেন না। একই অবস্থা ডেসটিনি ২০০০ লি:-এর কাস্টমার সার্ভিস
সেন্টারেও।
রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত ডেসটিনি ২০০০ লি:-এর কাস্টমার
সার্ভিস সেন্টারের জেনারেল ম্যানেজার এস এম মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে
বলেন, ‘কাস্টমার সার্ভিস সেন্টারেই ৫২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন যারা
সাড়ে ৪ মাস ধরে কোন বেতন-ভাতা পান না। নগদে আমাদের কোন পণ্য বিক্রি হয় না।
ব্যাংক এ্যাকাউন্ট জব্দ থাকায় প্রায় ৮ মাস ধরে কোন পণ্য বিক্রি করা যাচ্ছে
না।’ তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে ৬৭ কোটি টাকার পণ্য আটকে আছে। শিগগির
পণ্যের মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু তা খালাস করা যাচ্ছে না।
সূত্র
জানায়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বন্ধের পাশাপাশি পাঁচ মাস ধরে বাকি
রয়েছে অফিস ভাড়াও। অফিসের এসি, চেয়ার ইত্যাদি বিক্রি করে পাওনাদারদের টাকা
পরিশোধের চেষ্টা করা হচ্ছে।
ডেসটিনি ডিস্ট্রিবিউটর ফোরামের সদস্য
শহিদুল হক বলেন, ‘আমরা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত নই, প্রতারিত হইনি। ডেসটিনি-২০০০
লি.-এর ৪৫ লাখ ক্রেতা-পরিবেশক মানবেতর জীবন-যাপন করছেন; বর্তমান অবস্থায়
আমরা আমাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবে উদ্বিগ্ন।’
পরিবেশক ও
সাধারণ বিনিয়োগকারী আব্দুল্লাহ-আল মামুন বলেন, কারো বিরুদ্ধে অর্থ
আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। কিন্তু
প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডতো অবৈধ না। হাজার হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা হয় যে
প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা সচল রাখুক সরকার।
আরেক বিনিয়োগকারী ডেসটিনি
কর্মকর্তা-কর্মচারী পরিষদের আহবায়ক সাইফুর রহমান চৌধুরী টিপু বলেন, দেশে
মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) আইন না থাকলে সরকার আইন করুক। আমরা সেই আইন
মেনে চলবো।
ডেসটিনি গ্রুপের উপ-পরিচালক আশরাফুল আমীন ডেসটিনি
মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি. অবৈধ ব্যাংকিং করছে না দাবি করে
বলেন, সোসাইটি সদস্য ছাড়া কারো সাথে লেনদেন করে না। ডেসটিনি ২০০০ লি.-এর
যারা পরিবেশক শুধু তারাই ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি.-এর
সদস্য হতে পারবে। আর সদস্যরাই শুধু ঋণ নিতে পারবে। এছাড়া ডেসটিনি ট্রি
প্লানটেশন লি.-এর ৬ লাখ সদস্যও ডেসটিনি ২০০০ লি.-এর পরিবেশকরাই।
এক
প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ডেসটিনি ২০০০ লি.-এর ৪৫ লাখ পরিবেশকের মধ্যে আট
লাখ ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লি.-এর সদস্য। ডেসটিনির
কার্যক্রম এক রকম বন্ধ থাকায় এ ৪৫ লাখ পরিবেশক এখন বেকার বসে আছে।
২০০১
সালে জয়েন্ট স্টক থেকে অনুমোদন নিয়ে যাত্রা শুরু করে মাল্টিলেভেল কোম্পানি
(এমএলএম) ডেসটিনি ২০০০ লি.। বিভিন্ন পণ্য বিক্রির মধ্যে দিয়ে কোম্পানির
যাত্রা শুরু হলেও ২০০৫ সালে সমবায় অধিদপ্তর থেকে অনুমোদন নিয়ে ডেসটিনি
মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি যাত্রা শুরু করে। এরপর যাত্রা শুরু করে
ডেসটিনি ট্রি প্লানটেশন। বর্তমানে এ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩৭টি।
সংশ্লিষ্ট
সূত্র জানায়, ডেসটিনির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে সমালোচিত হচ্ছে
ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি ও ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশন
লিমিটেড। দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও এ দুটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেই বেশি।
দুর্নীতি
দমন কমিশনের তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, গাছ লাগানোর মাধ্যমে ডেসটিনি ট্রি
প্লান্টেশন লিমিটেড দুই হাজার ৩৩৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। কিন্তু প্রকৃত
পক্ষে তারা ৮১ লাখ গাছ লাগিয়ে সংগ্রহ করে ২৯৮ কোটি টাকা। বাকি দুই হাজার ৩৬
কোটি টাকা গাছ না লাগিয়েই সংগ্রহ করেছে। অথচ যৌথ মূলধনী কোম্পানি ও
ফার্মসমূহের নিবন্ধন কার্যালয় থেকে নেয়া স্মারকসংঘে বৃক্ষরোপণ বাবদ অর্থ
আদায়ের কোন কথা বলা ছিল না। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া ডেসটিনি
মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটিও অবৈধ ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে অর্থ
সংগ্রহ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ সূত্র জানায়, ডেসটিনির অবৈধ
কর্মকাণ্ড নিয়ে এর কার্যক্রম চালুর শুরুর দিকেই প্রতারণার অভিযোগ উঠেছিল।
২০০০ সালের ডিসেম্বরে বিনিয়োগ বোর্ডে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায়
ডেসটিনি ছাড়াও ‘জিজিএন’ ও ‘নিউওয়ে বাংলাদেশ’সহ সব এমএলএম প্রতিষ্ঠান ও
ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনের আওতায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত
নেয়া হয়।
এরপর ২০০৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থ সচিবের
কাছে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠায়। পরবর্তীতে ২০০৫
সালের ৪ এপ্রিল আবারো অর্থ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু
তত্কালীন জোট সরকার ও পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা
নেয়নি।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি
ডেসটিনির নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত
কমিটি গঠন করে। গত ১১ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশকালে তত্কালীন
বাণিজ্য সচিব গোলাম হোসেন ডেসটিনির মোট তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার অনিয়ম
তুলে ধরেন। এর মধ্যে এক হাজার ৪৫৪ কোটি টাকা সরাসরি তছরুপ করা হয়েছে। বাকি
দুই হাজার ৩৪৬ কোটি টাকার লেনদেন অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক।
তদন্ত
প্রতিবেদন প্রকাশকালে তত্কালীন বাণিজ্য সচিব সাংবাদিকদের জানান, ডেসটিনি
গ্রুপের ৩৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৬টির কোনো না কোনোভাবে কার্যক্রম আছে।
বাকি ১৩টি প্রতিষ্ঠান নাম সর্বস্ব। এর মধ্যে ডেসটিনি ২০০০-সহ ২৬ কোম্পানির
মধ্যে আর্থিক অনিয়ম হয়েছে ৪৭৩ কোটি টাকার। ডেসটিনি মাল্টিপারপাসে অনিয়ম
হয়েছে ৯৮২ কোটি টাকার। ২৬ কোম্পানির অস্বাভাবিক লেনদেন এক হাজার ২৮২ কোটি
টাকার। আর মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভে সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৬২
কোটি টাকার।
তিনি বলেন, আইন লঙ্ঘনের জন্য সরকারের সাতটি সংস্থা
আলাদাভাবে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। সংস্থাগুলো হলো
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ, অর্থ মন্ত্রণালয়,
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও
রেজসকো। এখন পর্যন্ত দুদক টাকা পাচারের অভিযোগে মামলা করেছে।
No comments:
Post a Comment