নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইসলাম
বর্তমানে নারীদের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ। হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, ইভটিজিং,
যৌতুকের কারণে নির্যাতনসহ তাদের সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন
করা হচ্ছে। বর্তমান নারীদের প্রতি বর্বর নির্যাতন দেখে মনে হয় আমরা একটি
আধুনিক জাহেলিয়াত পেয়েছি। সে যুগে কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করলে জীবন্ত
কবর দেয়া হতো। আর বর্তমানে ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে কন্যাভ্রƒণ ধ্বংস
করা হচ্ছে। চীন, ভারত, পশ্চিমা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গর্ভপাতকে বৈধ
হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে কন্যা সন্তানের পিতা
যৌতুক ও নারী নির্যাতনের নির্মম বলি থেকে ভবিষ্যতে মেয়ে সন্তানকে রেহাই
দেয়ার জন্য ডাক্তারি পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় জেনে কন্যাভ্রƒণকে আগেই
হত্যা করছে। আর সেখানে প্রচার করা হচ্ছে। ‘Pay 500 rupees and save
500000!’ এফবিআইর ক্রাইম রিপোর্টের এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, প্রতি বছর
১৫ হাজার আমেরিকান মহিলা তাদের স্বামী, পূর্বস্বামী ও বয়ফ্রেন্ডের পৈশাচিক
নির্যাতনে প্রাণ হারায়। দেশটিতে অপমৃত্যুর শিকার নারীদের ৩৪ শতাংশ নিহত
হয় স্বামীদের নির্যাতনে। নির্যাতিত নারীদের ১০ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা
অবস্থায় ওই নির্মম অবস্থার শিকার হয়। (সূত্র : ড. মু: ইব্রাহীম খলিলÑ
ইসলামে সামাজিক ব্যবস্থা ও পরিবার কল্যাণ পৃ: ১৭৩)
বাংলাদেশেও নারী
নির্যাতনের হার কম নয়। আমাদের দেশে নারী নির্যাতনের হার দিন দিন বৃদ্ধি
পাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন মতে, গত জানুয়ারি থেকে জুন
পর্যন্ত ছয় মাসে ৩৪৫ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে
আত্মহত্যা করেছেন ১৭ জন, নিহত ১ জন, আহত ৩৫ জন, লাঞ্ছিত ৫৯ জন, অপহরণ ৮ জন,
ধর্ষণের অপচেষ্টার শিকার ৯ জন। নারীর প্রতি যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করতে
গিয়ে ১০৫ জন পুরুষ সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ জন বখাটে বা
তাদের পরিবারের সদস্যদের আক্রমণে নিহত ও ৯৮ জন আহত হয়েছেন। এ সময়কালে যৌন
হয়রানির প্রতিবাদ করতে গিয়ে বখাটের হাতে ২৩ জন নারী আহত ও ১ জন নারী
লাঞ্ছিত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, একই সময়ে ২৯৭ জন নারী ও
মেয়েশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১০৩ জন নারী, ১৯১ জন
মেয়েশিশু ও তিনজনের বয়স জানা যায়নি। ওই ১০৩ জন নারীর মধ্যে ৩৫ জনকে
ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ও ৫৭ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৯১ জন
মেয়েশিশুর মধ্যে ১৯ জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে এবং ৫০ জন গণধর্ষণের
শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের কারণে চার নারী ও সাতজন শিশু আত্মহত্যা করেছে। এ
সময়কালে একজন শিশু ও একজন নারী যথাক্রমে আনসার ও সেনাবাহিনী সদস্যের হাতে
নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। (আমার দেশ ২২ জুলাই, ২০১১)।
দৃষ্টিশক্তি
নিয়ন্ত্রণ ও লজ্জাস্থানের হিফাজত করা : ইসলাম চায় নারী নির্যাতনের সব পথ
বন্ধ করতে। শয়তানের প্রথম ফাঁদ দৃষ্টি শক্তি দ্বারা নর-নারীকে আকৃষ্ট করা
এবং ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যাওয়া। এ জন্য ইসলাম এ ব্যাপারে আগেই সতর্ক
করে দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের
দৃষ্টিকে সংযত করে ও তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।’ (সূরা : নূর-৩০) শুধু
পুরুষ নয়, মহিলাদেরও চু এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করতে হবে। অপর আয়াতে
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টিকে সংযত করে ও
তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করে।’ (সূরা : নূর-৩১)
এ ছাড়া হাদিসে
এসেছে, ‘হজরত বুরাইদা কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:) একদা আলী (রা:)-কে
বললেন, হে আলী! পর নারীর প্রতি (হঠাৎ) একবার দৃষ্টি পড়লে দ্বিতীয়বার আর
দৃষ্টিপাত করো না। কারণ প্রথমবার দৃষ্টিপাতের জন্য গুনাহগার না হলেও
ইচ্ছাকৃতভাবে পুনরায় দৃষ্টিপাত করলে গুনাহ হবে।’ (তিরমিজি)
সৌন্দর্য
প্রকাশ না করা : বর্তমানে ইভটিজিং ও ধর্ষণের অন্যতম কারণ হচ্ছেÑ নারীদের
বেপর্দা চলাফেরা করা। এ ব্যাপারে সতর্ক করে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘মুমিন
নারীরা যেন সাধারণত প্রকাশ থাকে তা ব্যতীত তাদের আভরণ প্রদর্শন না করে,
তাদের গলা এবং বুক যেন মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে।’ (সূরা নূর : ৩১)
‘জাহিলিয়া যুগের মতো সাজসজ্জা করে রাস্তায় বের হয়ো না।’ (সূরা :
আহজাব-৩৩)
হাদিসে এসেছে, ‘ওই সব নারী যারা হবে পোশাক পরিহিতা অথচ
নগ্না। যারা পর পুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হবে। তাদের
মাথাগুলো হবে বড় বড় হেলে যাওয়া উটের কুঁজের ন্যায়। এসব নারী জান্নাতে
প্রবেশ তো করতে পারবেই না, এমনকি জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।’ (আল-হাদিস)
অশ্লীলতা
প্রসারের সব পথ বন্ধ রাখা : দুনিয়াতে যারা অশ্লীলতা প্রচার ও প্রসারের
কাজে নিয়োজিত তাদের লক্ষ্য করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যারা মুমিনদের মধ্যে
অশ্লীলতা কামনা করে, তাদের জন্য আছে দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তি।’
(সূরা : ১৯)
ধর্ষণ অপরাধের শাস্তি : বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ধর্ষণ
প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই অপকর্ম বৃদ্ধির মূল কারণÑ অপরাধীদের
শাস্তির বিধান যথাযথভাবে কার্যকর না করা। পশ্চিমা দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন
দেশে ধর্ষণের উপযুক্ত বিচার না থাকায় সেখানে ধর্ষণ কমাতে পারেনি, সেখানে
আরো ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়,
ধর্ষণের শাস্তিস্বরূপ ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার বিয়ে দিয়ে দেয়া হচ্ছে, আবার
কোথায়ও উভয়কেই শাস্তি দেয়া হচ্ছেÑ যা ইসলামে নিষিদ্ধ এবং মানবাধিকারের
চরম লঙ্ঘন। কেননা, এ কাজ সংঘটিত হয় পুরুষ কর্তৃক জোরপূর্বক। এ জন্য অপরাধী
ধর্ষক, ধর্ষিতা নয়। ইসলাম এই কথাটিরই সমর্থন করে। ইসলাম বলেÑ কাজটি যদি
নারীর অমতে হয়, তাকে যদি এ কাজে বাধ্য করা হয় এবং সাক্ষী প্রমাণের
ভিত্তিতে নারীর অসহায়ত্ব ও অমত সুস্পষ্ট ধরা পড়ে তাহলে এ জন্য নারী কোনো
শাস্তি পাবে না। বরং এ জন্য ধর্ষক পুরুষই শাস্তি পাবে। সে অবিবাহিত হলে
তাকে এক শত কশাঘাত করা হবে। আর সে বিবাহিত হলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। এ
ক্ষেত্রে নারীর অব্যাহতি প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘যে তাদেরকে ব্যভিচারে
বাধ্য করে তাহলে তাদের জবরদস্তির পর আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
(সূরা নূর : ৩৩)
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ‘জনৈক ক্রীতদাস এক ক্রীতদাসীর
সাথে জোরপূর্বক ব্যভিচার করল। এই বিচার হজরত উমর ইবনে খাত্তাব (রা:)-এর
আদালতে পেশ করা হলো। তিনি ঘটনা তদন্ত করে ক্রীতদাসীকে বেকসুর খালাস দিলেন।’
(সহিহ আল বুখারি)
যৌতুক প্রতিরোধ : বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী
নির্যাতনের নেপথ্য যৌতুক প্রথার বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে
বেশির ভাগ নারীরা নির্যাতিত হয় যৌতুকের কারণে। বিশেষত যৌতুক প্রথা এসেছে
হিন্দু ধর্ম থেকে। এটা প্রথমাবস্থায় হিন্দু ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
কালের আবর্তনে ধীরে ধীরে এই নিষ্ঠুর প্রথাটি মুসলিমসমাজে অনুপ্রবেশ করে, যা
বর্তমানে ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে যৌতুকবিরোধী আইন থাকার
পরও তা যথাযথ বাস্তবায়ন না থাকার কারণে দিন দিন এটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই
নিষ্ঠুর এবং অমানবিক কাজ থেকে মুক্তি পেতে হলে ইসলামি বিধান মান্য করা
ব্যতীত বিকল্প পথ বা মত কোনোটাই হতে পারে না। কেননা, ইসলাম বলে কোনো পুরুষ
অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হলে বিয়ে করতে পারবে না, আর যেহেতু বেশির ভাগ
পুরুষ যৌতুক নেয় আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান হওয়ার জন্য। এ ব্যাপারে আল্লাহ
তায়ালা বলেন, ‘যাদের বিয়ের সামর্থ্য নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে
অভাব মুক্ত না করা পর্যন্ত তারা যেন সংযম অবলম্বন করে।’ (সূরা : নূর, ৩৩)
আবার
ইসলাম বিয়ের সময় নারীকে মহর প্রদান করে নারীর মর্যাদা এবং যৌতুকের পথ
রুদ্ধ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্ত্রীদের মহর দিয়ে
দাও।’ (সূরা : নিসা, ৪)
No comments:
Post a Comment