শিশুর হাঁ করে ঘুমানো
অনেক সময় লক্ষ করা যায়, শিশুরা হাঁ করে বা মুখখুলে ঘুমাচ্ছে। নাক দিয়ে আমরা শ্বাস গ্রহণ করি ও শ্বাস ত্যাগ করি। নাক দিয়ে বাতাস ঢুকে তা প্রবেশ করে ন্যাসোফ্যারিংস, ল্যারিংস বা স্বরযন্ত্র হয়ে ট্রাকিয়া বা শ্বাসনালীতে। শ্বাসনালী থেকে ব্রংকাস ও ব্রনকিওল হয়ে অ্যালভিওলাই বা ফুসফুসের বায়ুথলিতে ঢোকে বাতাস। আবার শ্বাসত্যাগের সময় পুনরায় এ পথেই বাতাস বের হয়। এই বাতাস আসা-যাওয়ার পথে যদি কোনো বাধা থাকে তবে শিশু নাক দিয়ে শ্বাস না নিয়ে মুখ দিয়ে নেবে। আর সে কারণেই মুখখোলা বা হাঁ করে ঘুমাবে। এ ক্ষেত্রে শিশু ঘুমানোর সময় নাক ডাকতেও পারে।
নানা কারণে এমনটি হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছেÑ নাকের হাড় বাঁকা থাকা, নাকের মাংসল অংশ ফুলে থাকা, নাকে পলিপ থাকা, কোয়ানাল অ্যাস্ট্রেসিয়া, শিশুর টনসিল ও অ্যাডিনয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গেলেও শিশু মুখখুলে ঘুমায় এবং এ দুটি কারণই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
টনসিলের প্রদাহ বা টনসিলাইটিস হলে টনসিল বড় হতে পারে। বারবার টনসিলাইটিস হওয়া, শিশুর গলা ব্যথা, জ্বর, সর্দি-কাশি, কান ব্যথা ইত্যাদি প্রধান লক্ষণ। এ রকম হলে অবশ্যই নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন। অনেকের ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে যে টনসিলাইটিস হলেই নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ সার্জন টনসিল কেটে ফেলবেন অর্থাৎ অপারেশন করবেন। কিন্তু এমনটি ভাবার কোনোই কারণ নেই। চিকিৎসা করে অসুস্থ টনসিল রেখে দিলে শিশুর হৃদযন্ত্রের অসুখ, রিউম্যাটিক হাইডিজিজ ও হার্টের ভাল্ব নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সুতরাং টনসিলাইটিসের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অবশ্যই করাবেন।
কিছু শিশু প্রায় সারা বছর সর্দি-কাশিতে ভোগে, মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়, হাঁ করে ঘুমায়, নাক ডাকে, খাবারে অরুচি, ওজন কমে যাওয়া, ওপরের পাটির সামনের দিকের দাঁত এগিয়ে আসা ইত্যাদি অ্যাডিনয়েড গ্লান্ডের সংক্রমণ এবং বড় হয়ে যাওয়ার লক্ষণ। অ্যাডিনয়েড বড় হলে ও সংক্রমণের কারণে শিশুর কানে ব্যথা ও কানে পুঁজ হতে পারে। এ ছাড়া নাক দিয়ে রক্ত পড়া ও কথা বলতেও অসুবিধা হয়। এই অবস্থায় অবশ্যই নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রেও ওষুধ দিয়ে চিকিৎসার পাশাপাশি আপনার শিশুর স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনেই অ্যাডিনয়েড গ্লান্ড অপারেশন করে বাদ দিতে হতে পারে। অ্যাডিনয়েড বড় হলে এবং অপারেশন না করলে শিশুর কানে শোনার সমস্যা এবং বুদ্ধিমত্তা বিকাশে ব্যাহত হতে পারে।
শিশুর টনসিল ও অ্যাডিনয়েড অপারেশন নিয়ে ভয় পাওয়া অহেতুক। শিশুকে অজ্ঞান করে, বাইরে থেকে কোনো কাটাছেঁড়া না করে, হাঁ করে ভেতর থেকে টনসিল ও অ্যাডিনয়েড গ্লান্ড সার্জারি করে ফেলে দেয়া হয়। এতে সময়ও কম লাগে এবং মাত্র এক দিন পরই হাসপাতাল থেকে শিশুকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন। শিশুর ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা খুবই কম। বরং আগেই বলা হয়েছে, শিশুর স্বাস্থ্যগত কারণেই এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে অপারেশন করাবেন।
আর অবশ্যই মনে রাখবেন, আপনার শিশু যদি মুখখোলা বা হাঁ করে ঘুমায় কিংবা নাক ডাকে তবে তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান ও পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা করান।
লেখিকা : সহযোগী অধ্যাপিকা, ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ।
চেম্বার : স্ট্যান্ডার্ড মেডিক্যাল সার্ভিস লিমিটেড, ২০৯/২, এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা।
No comments:
Post a Comment