সিভিল এভিয়েশনে সুন্দরীদের দাপট
সিভিল এভিয়েশনের সুন্দরীরাই স্বর্ণ চোরাচালানের সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। এদের সহায়তায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে একাধিক অবৈধ স্বর্ণের চালান দেশে ঢুকেছে। সর্বশেষ সাড়ে ১৩ কেজি স্বর্ণ পাচারকালে গ্রেপ্তারকৃত ৫ জনের কাছ থেকে এ তথ্য জানতে পেরেছে তদন্তকারী সংস্থা- মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে সিভিল এভিয়েশনের সিকিউরিটি সুপারভাইজার খন্দকার নিজাম উদ্দিন, সিকিউরিটি গার্ড আবুল কালাম, চালানের বাহক মনোয়ারুল হক, স্বর্ণ আমদানিকারক দেব কুমার দাশ ওরফে দেবু ও একটি গোয়েন্দা সংস্থার ফিল্ড অফিসার আবদুল আজিজ শাহ। দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে তারা স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত সদস্যদের নাম বলেছে। এদের মধ্যে সিভিল এভিয়েশনের লাগেজ স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর রেখা পারভীন ও লায়লাসহ অন্ততপক্ষে আরও ১২ জনের তথ্য দিয়েছে। বর্তমানে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাদের ধরতে বিভিন্ন জায়গায় অভিযান পরিচালনা করছে। সূত্র মতে, সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক রেখা পারভীন ও লায়লা ভারতে পালিয়ে গেছে। তার সহযোগী আরও ৪-৫ তরুণী গ্রেপ্তার এড়াতে গা-ঢাকা দিয়েছে। এর বাইরে এ সিন্ডিকেটে জড়িত দু’টি মানি এক্সচেঞ্জ ও দু’টি জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পেয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি মোল্লা নজরুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের বেশির ভাগই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। স্বর্ণ পাচারে জড়িতদের তথ্য দিয়েছে। তবে সিকিউরিটি সুপারভাইজার খন্দকার নিজাম উদ্দিন গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিলেও আদালতের কাছে অস্বীকার করেছে। এ কারণে তাকে ফের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। গত ১০ই সেপ্টেম্বর দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টয়লেটের ফ্ল্যাশ ট্যাংকি থেকে প্রায় সাড়ে ১৩ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ওই স্বর্ণ দুবাই থেকে আসা একটি ফ্লাইটে নিয়ে আসে মনোয়ার নামে এক চোরাকারবারি। বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের সদস্যরা গোপনে অভিযান চালিয়ে পলিথিনে মোড়ানো একটি প্যাকেটে ১১৭টি সোনার বার উদ্ধার করে। এর আনুমানিক মূল্য ৭ কোটি ২ লাখ টাকা। পরে মনোয়ারুল হককে আটক করে ওইদিনই বিমানবন্দর থানায় বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করে এপিবিএন কর্তৃপক্ষ। মামলা তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় গোয়েন্দা পুলিশকে। পরে গোয়েন্দা পুলিশ ১১ই সেপ্টেম্বর মনোয়ারকে আদালতে হাজির করে ৭ দিনের রিমান্ডে এনে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করে। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে মনোয়ারুল হক জানায়, স্বর্ণের মূল পাচারকারী দেব কুমার দাশ ওরফে দেবু। তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ করে নির্বিঘ্নে চালান বাইরে বের করে দেয়ার দায়িত্ব পালন করে থাকে সিভিল এভিয়েশনের স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর ও উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা। এদের সহায়তা করে থাকে সিভিল এভিয়েশনের সিনিয়র নিরাপত্তাকর্মী আবুল কালাম এবং গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই’র ফিল্ড অফিসার আবদুল আজিজ শাহ। এ তথ্য পাওয়ার পর গোয়েন্দা পুলিশ ওই দু’জনকেও গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে, বিমানবন্দর থেকে স্বর্ণের চালানটি বাইরে বহন করার দায়িত্ব পালন করতো আবদুল আজিজ শাহ। পরে গ্রেপ্তারকৃত ওই ৪ জনই স্বর্ণ পাচারের কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এদিকে ঘটনার পর থেকেই লাপাত্তা হয়েছে স্ক্যানিং মেশিন অপারেটর রেখা পারভীন ও লায়লাসহ ৪-৫ তরুণী। গোয়েন্দাদের ধারণা, সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক রেখা পারভীন ভারতে পালিয়ে গেছে। তার সহযোগীরাও কর্মস্থলে না গিয়ে ছুটি নিয়ে পলাতক রয়েছে। ইতিমধ্যে ওই তরুণীদের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানায় গোয়েন্দা পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। গোয়েন্দারা জানান, তাদের কাছে তথ্য রয়েছে রেখা পারভীন ও লায়লাই স্বর্ণ চোরাচালান সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রক। পাচারের দিন নির্ধারিত হওয়ার আগেই তারা ছুটি নিয়ে থাকে। পরে ওইদিন উপস্থিত হয়ে বিমানবন্দরের বোর্ডিং এলাকায় চলে যায়। সেখানে গিয়ে স্বর্ণের বার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গায় ভরে নিরাপদে বাইরে বেরিয়ে আসে। পদে ছোট হলেও রূপ দেখিয়ে সিভিল এভিয়েশনের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের নজর কাড়তে পটু তারা। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়েই বিমানবন্দরে চোরাচালানিরা নিরাপদ রুট গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে ওই তরুণীরা। এদের সঙ্গে কেবিন ক্রু ও বিমানবালাদের সম্পর্ক রয়েছে। সূত্র মতে, রেখার বাড়ি শরীয়তপুর জেলায়। সাড়ে ১৩ কেজি স্বর্ণ ধরা পড়ার পরপরই চারদিনের ছুটি নেয়। ওই ছুটি শেষ হলেও এখন পর্যন্ত কাজে যোগ দেয়নি। এমনকি বাড়িতেও যায়নি। একই কায়দায় লায়লাসহ আরও ৪-৫ জন তরুণী পলাতক রয়েছে। সূত্র মতে, স্বর্ণ চোরাচালানি সিন্ডিকেটে অসাধু স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও মানি এক্সচেঞ্জ কর্মকর্তারাও জড়িত। বিভিন্ন দেশের মুদ্রা বিনিময় হার পর্যবেক্ষণ করে সুবিধাজনক লাভ বিবেচনা করে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে অবৈধভাবে স্বর্ণ নিয়ে আসে। চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের স্বর্ণ ব্যবসায়ী দেব কুমার দাশকে গ্রেপ্তার করার পর ওই তথ্য জানতে পারে গোয়েন্দারা। তার নির্দেশনাতেই দুবাই থেকে চালানটি আনা হয়। টাকা পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। সে টাকায় দুবাইয়ে স্বর্ণ কিনে একদিন পরই তা নিয়ে আসে মনোয়ার। এজন্য তাকে ফ্লাইটের রিটার্ন টিকিট ছাড়াও পারিশ্রমিক হিসেবে ৩০ হাজার টাকা দেয়ার চুক্তি হয়েছিল। দেব কুমারের জন্য এভাবে প্রায়ই চালান এনেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানায় মনোয়ার। গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, রেখা পারভীনের নির্দেশে বিভিন্ন পয়েন্টে দায়িত্ব পালনকারী তরুণীরা চোরাচালানে সহায়তা করে। বিমানবন্দরের প্রবেশপথ থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত প্রত্যেক স্তরে লোক দিয়ে স্বর্ণের চালানগুলো নিরাপদে পার করে দেয় তারা। এরপর সিভিল এভিয়েশনের সিটিওডি সুপারভাইজার খন্দকার নিজাম উদ্দিনের নির্দেশ মতে নিরাপত্তাকর্মী আবুল কালাম ও গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআইর ফিল্ড অফিসার আবদুল আজিজ শাহ মিলে চালানগুলো বিমানবন্দরের বাইরে আসকোনা হাজী ক্যাম্প এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে যায়। সেখান থেকে স্বর্ণের চালান সুবিধামতো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। ডিবি পুলিশ উত্তরা এলাকা থেকে ১৯শে সেপ্টেম্বর দেব কুমার দাশকে গ্রেপ্তার করে। ২০শে সেপ্টেম্বর আদালত তার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। ডিবি জিজ্ঞাসাবাদে দেব কুমার সোনা চোরাচালানের কথা স্বীকার করেন এবং তার সঙ্গে রেখা পারভীনসহ নিরাপত্তাকর্মী কালাম ও এনএসআই’র ফিল্ড অফিসার আবদুল আজিজ শাহের সম্পৃক্ততার কথা বলেন। গত ২রা অক্টোবর আদালতে এ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন দেব কুমার। এর আগে ২১শে সেপ্টেম্বর ডিবি পুলিশ বিমানবন্দরের গোল চত্বর থেকে সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তাকর্মী আবুল কালামকে গ্রেপ্তার করে। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকেও রিমান্ডে নেয়া হয়। গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে সে জানায়, স্বর্ণ পাচারের কাজ করিয়ে বিনিময়ে রেখা প্রতি চালানে মোটা অঙ্কের টাকা দিতো। ২৯শে সেপ্টেম্বর কালাম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। এদিকে, স্বর্ণ পাচারে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়ায় এনএসআই কর্তৃপক্ষ ফিল্ড অফিসার আবদুল আজিজ শাহকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে ২৫শে সেপ্টেম্বর ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে। ডিবি হেফাজতে তিনি বিমানবন্দরের বোর্ডিং ব্রিজ থেকে স্বর্ণ পাচারের কথা স্বীকার করে এবং ২৭শে সেপ্টেম্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, স্বর্ণ পাচারের মূল হোতা সিভিল এভিয়েশনের লাগেজ স্ক্যান অপারেটর রেখা পারভীন ও লায়লাসহ একাধিক তরুণীকে খুঁজছে পুলিশ। তাদের ধরতে পারলেই পাচারকারী চক্রের সকল সদস্যের পরিচয় উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে বলে জানান।
কে এই রেখা: সিভিল এভিয়েশনে চাকরি নেয়ার আগে কিছুই ছিল না রেখার। চাকরি নেয়ার পরেই রাতারাতি কপাল খুলে যায় তার। পদবি- লাগেজ স্ক্যানিং অপারেটর। পদটি মানে ছোট হলেও রূপে ধরাশায়ী করতেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের। জড়িয়ে পড়ে অবৈধ সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটে। এক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রক বনে যায়। ৪-৫ বছরের মধ্যেই বিপুল সম্পদের মালিক হয়ে যায়। উত্তরায় কিনে সাড়ে ৩ কোটি টাকায় দু’টি ফ্ল্যাট। গাজীপুরে নিজের নামে ১২ কাঠার জমি কেনে। নিজে চড়ে বেড়ায় কালো একটি অ্যালিয়ন গাড়িতে। এক ছেলে ও এক মেয়ের মা রেখা পারভীন থাকে উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে। স্বর্ণের চালানটি উদ্ধারের পর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ মোবাইল ফোন প্রযুক্তির সহায়তায় তাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করছে। বর্তমানে রেখা গোয়েন্দা পুলিশের ডিজিটাল নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছে। অন্যদিকে নিজাম উদ্দিন ১৯৯৫ সালে দৈনিক ৩০ টাকা বেতনে চাকরি নিয়েছিলেন। ২০০৩ সালে সিকিউরিটি সুপারভাইজারের দায়িত্ব পায়। এরপর থেকেই অবৈধ সম্পদের পাড়ার গড়েন। উত্তরায় ১৮শ’ বর্গফুটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। একাধিক ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার সঞ্চয়ী হিসাবের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। নিজামের বাড়ি কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার ঝাউতলা গ্রামে। তার পিতার নাম খন্দকার মোজাফ্ফর হোসেন। বর্তমানে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ৩ নম্বর রোডের ৭ নম্বর বাড়ির বি/৩ নম্বর ফ্ল্যাটে থাকতেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের মাস্টার্সের সনদপত্র সংগ্রহ করে তিনি চাকরির পদোন্নতি নিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
No comments:
Post a Comment