শত বছরের সেরা রেকর্ড
ইতিহাসগড়া দিনে ইতিহাসই গড়লেন আবুল হাসান রাজু। মৌলভীবাজারের ছেলে এই বোলার পুরো জাতিকে মাতালেন ব্যাট হাতে। দলকে উদ্ধার করলেন চরম বিপর্যয়ের হাত থেকে। তার সাবলীল ব্যাটিংয়েই খুলনা তথা গোটা দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মুখে হাসি ফুটেছে। না হয়, মাত্র তিন আগে শেষ হওয়া মিরপুর টেস্টে অর্জিত সব কৃতিত্বই ম্লান হয়ে যাচ্ছিল। তবে পড়ন্ত বেলায় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ আর আবুল হাসান দারুণভাবে বাংলাদেশকে খেলায় ফিরিয়ে আনেন।। খুলনায় অভিষেক টেস্টের প্রথম দিনটি এর চেয়ে স্মরণীয়ভাবে বোধহয় শেষ হতে পারতো না। নানা প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে অনেক আশা আর আনন্দ নিয়ে মাঠ আর বাইরে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন হাজারো ক্রিকেটপ্রেমী নারী আর পুরুষ। কিন্তু রোদের তেজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের আকাশ ভারি হয়ে উঠেছিল হতাশার কালো মেঘে। তবে দিনের আলো নিভে গেলেও স্টেডিয়ামে আলো কমতে দেননি আবুল হাসান রাজু। বাংলাদেশে যখন ‘আবুল’ নামটি রীতিমতো খলনায়কে পরিণত হচ্ছিল ঠিক তখন আবুল হাসান দেশের গর্ব হয়ে এলেন। গড়লেন শত বছরের রেকর্ড। পড়ন্ত বিকালে নবম উইকেটে ব্যাট করতে নেমে হাঁকালেন অসাধারণ এক সেঞ্চুরি। সঙ্গে সঙ্গে ছুঁয়ে ফেললেন ১১০ বছরের ইতিহাসও। ক্রিকেট ইতিহাসে টেস্ট অভিষেকে ১০ নাম্বারে ব্যাট করতে নেমে সেঞ্চুরি হাঁকানোর কৃতিত্ব তার আগে মাত্র একজনেরই ছিল। ১৯০২ সালে মেলবোর্নে আস্ট্রেলিয়ার র্যাগি ডাফ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্টেই ১০৪ রান করেছিলেন। তবে তার সেটি ছিল দ্বিতীয় ইনিংসে। আর আবুল হাসান করেছেন ১০৮ বলে অপরাজিত ১০০ রান করেছেন প্রথম ইনিংসে। সেদিক থেকে আবুল হাসানকে অনন্যই বলতে হবে। আর চার রান হলে তিনি ১১০ বছরের রেকর্ড ভেঙে এই তালিকায় থাকবেন সবার উপরেই। বাংলাদেশের পক্ষে অভিষেক টেস্টে আমিনুল ইসলাম বুলবুল আর মোহাম্মদ আশরাফুলের পর হাসান তৃতীয় ব্যটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি হাঁকালেন। দিন শেষে বাংলাদেশের স্কোর ৮ উইকেটে ৩৬৫ রান। ১৯৩ রানে অষ্টম উইকেট পতনের পর যোগ হয়েছে আরও ১৭২ রান। ৭২ রানের ইনিংস খেলে হাসানকে যোগ্য সাহচর্য দেন সহঅধিনায়ক মাহমুদুল্লাহ। টেস্ট ইতিহাসে নবম উইকেটে এটি চতুর্থ সেরা জুটি।
দিন শেষে সংবাদ সম্মেলনে এসে আবুল হাসান বলেন, আমি আসলে সেঞ্চুরি বা রেকর্ডের জন্য খেলিনি। দলের জন্য সেই মুহূর্তে এমন একটা ইনিংস খেলা প্রয়োজন ছিল, তা-ই করেছি। অভিষেক ম্যাচে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরি করা আমিনুল ইসলাম বুলবুল এখন দেশের বাইরে। তবে দ্বিতীয় সেঞ্চুরিয়ান আশরাফুল টেস্ট দল থেকে বাদ পড়ায় ঘরে বসেই দেখেছেন আবুল হাসানের অসাধারণ এই ইনিংস। তিনি বলেন, আমি এক কথায় বলবো অসাধারণ ইনিংস। আমরা দু’জন অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করেছি ব্যাটসম্যান হিসেবে আর ও তো বোলার। সেই হিসেবে ওর সেঞ্চুরিটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও আনন্দের। বলতে পারেন ওর জন্য এমন একটি ইনিংস আমাদের চেয়েও দ্বিগুণ খুশির। আর দলের জন্যও বিশেষ উপকারে এসেছে ওর সেঞ্চুরিটি। নয়তো বাংলাদেশের স্কোর বোর্ডে দিন শেষে এত রান জমা পড়তো না।’
টস জিতে ব্যাট করতে নেমে ৯৮ রানেই ৫ উইকেটের পতন ঘটে বাংলাদেশের। এমন বিপর্যয় ভাবতেই পারেননি খুলনায় শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট ম্যাচ দেখতে আসা দর্শকরা। তবে তাদের হতাশা দূর করেছেন জাতীয় দলে সিলেটের নতুন সংযোজন আবুল হাসান রাজু। তাই খুলনার দর্শকরা তার নাম নিয়ে মিছিল করতে করতে স্টেডিয়াম ছাড়েন। তবে আবুল হাসানের কাছে তার ইনিংসটা হলো নিজের সাধারণ খেলার ফল। তিনি বলেন, আসলে বাজে বল যখন এসেছে তখন আমি মেরেছি।
টস জেতার আনন্দ ম্লান হতে সময় লাগেনি বেশি। দলীয় মাত্র ৫ রানে নাজিমুদ্দিনের আউট দিয়ে হতাশার দিন শুরু। মধ্যাহ্ন বিরতির আগে প্রথম সেশনে ৮৮ রানে ৩ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এর পর দলীয় ৯৮ রানে ৫ম উইকেটের পতন। নাজিমের বিদায়ের পর তামিম ইকবাল ৩২, শাহরিয়ার নাফিসের ২৬ রানের কল্যাণে একটু ধাক্কা সামলে ওঠে দল। তবে দ্বিতীয় উইকেটে ৫৯ রানের জুটি ভাঙ্গে শাহরিয়ার নাফিস আউট হলে। দলের স্কোর তখন ৬৪। দলীয় ৭৭ রানের সময় তামিম, ৯৩ রানে নাঈম ইসলাম (১৬) ও ৯৮ রানের সময় সাকিব আল হাসান ১৭ রানে আউট হলে দল চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে। তবে সেখান থেকে দলকে টেনে তোলেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম ও নাসির হোসেন। মুশফিক ৩৮ ও নাসির হোসেন তার তৃতীয় টেস্ট ফিফটি তুলে প্রাথমিক বিপর্যয় সামাল দেন। দলীয় ১৮৫ রানের সময় ৬৮ বলে ৮টি চার ও ১ টি ছয়ের মারে ৫২ রান করা নাসির আউট হন। এরপর ১৯৩ রানে আবারো ব্যাটিং বিপর্যয় ঘটে। মুশফিকের আউটের পর সোহাগ গাজীও ফিরে যান ০ রানে। ৮ উইকেটে স্কোর ১৯৩। আর এই আশঙ্কা আর সংশয়ের ওপর দাঁড়িয়েই শুরু হয় মাহমুদুল্লাহ ও আবুল হাসানের সংগ্রাম। রবি রামপাল ইনজুরিতে খেলতে না পারায় দলে জায়গ হয়েছিল ফিদেল এডওয়ার্ডসের। কিন্তু তিনিও কম নন। দূর্দান্ত বোলিংয়ে নিয়েছেন ১৬ ওভারে ৮১ রানের খরচায় বাংলাদেশের ৫টি উইকেট। স্যামি নিয়েছেন দু’টি আর পারমল একটি। হতাশায় কেটেছে বিশ্ব কাঁপানো সুনীল নারাইনের।
No comments:
Post a Comment