Pages

Tuesday, November 27, 2012

কাঁদছে বাংলাদেশ

কাঁদছে বাংলাদেশ


নিশ্চিন্তপুরের বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ। তাজরিনের ফ্লোরে ফ্লোরে গলিত লাশ। স্বজনহারাদের বুকফাটা আর্তনাদ। চারদিকে শোকের মাতম। শোকাবহ আশুরার আগের রাতে সেখানে ঘটে গেছে মহাপ্রলয়। তৈরী পোশাক শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার আগুনে পুড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে ১১০টি প্রাণ। তাদের সবাই সচ্ছলতার বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে আসা নিম্ন আয়ের মানুষ। আশুরার তাজিয়াকে ম্লান করে দিয়েছে নিশ্চিন্তপুরে এ লাশের মিছিল। মোহররমের মাতমকে হার মানিয়েছে তাজরিনের মাতম। এই মাতম স্বজন হারানোর, তাদের অঙ্গার দেহটি খোঁজার। নিশ্চিন্তপুরে কেউ খুঁজছেন মেয়েকে। কেউ ছোটাছুটি করছেন স্ত্রীর পোড়া লাশটির খোঁজে। বোনের খোঁজে গ্রাম থেকে ছুটে এসেছেন ভাই। হাজারো উৎসুক মানুষের স্রোত। নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ফেরা উদ্বিগ্ন মানুষ। সবার গন্তব্য তাজরিন ফ্যাশন ও পাশের দেওয়ান ইদ্রিস নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। দৃষ্টি অঙ্গার হওয়া স্বজনের লাশের সারিতে। রোববার সকাল থেকে প্রকাশ হতে থাকে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতার দৃশ্য। তাজরিন ফ্যাশনের নিচ থেকে ছ’তলা পর্যন্ত কেবল লাশ আর লাশ। পুড়ে অঙ্গার সেলাই মেশিনের ফাঁকে, ফ্লোরের কোনায়, বাথরুমে ক্ষতবিক্ষত লাশ। কোনটির হাত নেই, কোনটির পা বা মাথা নেই। এখানে ওখানে বীভৎসতা ছড়াচ্ছে নিঃসঙ্গ হাত-পা অথবা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন শরীরের অন্য কোন অঙ্গ। প্রাণহীন পোড়া শরীরগুলো যেন এক এক খণ্ড অঙ্গার। কোনটা এতটাই পুড়েছে যে চেহারা চেনার যো নেই। রোববার দুপুরেও গুমোট বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ, কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়া, নিভু নিভু আগুন ও তীব্র উত্তাপ ছড়ানো দেয়ালগুলো যেন শনিবার রাতের বিভীষিকারই সাক্ষ্য দিচ্ছিল। তখন উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে ফায়ার ব্রিগেড ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক আবদুল মতিন জানান, কারখানার ভেতরে বিভিন্ন তলায় পাওয়া গেছে ১০০টি লাশ। তখন বাইরে ছিল স্বজনের আহাজারি আর শোকের মাতম। কারণ, বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোতে আগে বিভিন্ন সময়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। কিন্তু এত বেশি প্রাণহানি ঘটেনি কখনও। এরপর সেনাবাহিনী-ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল ভবনের ভেতর থেকে এক এক করে বের করে ১১০টি লাশ। লাশগুলো রেডক্রিসেন্টের কফিন ব্যাগে করে নিয়ে রাখা হয় পাশের স্কুলের বারান্দায়। সেখানে হাত, পা, গায়ের জামার পোড়া অংশ দেখে মাত্র ৪৩ জন শ্রমিককের লাশ শনাক্ত করেছেন স্বজনরা। ৫৮টি লাশ পড়ে থাকে সেখানে। তাদের শনাক্ত করার মতো কোন চিহ্নই নেই। কিন্তু স্বজনরা তো পেতে চায় স্বজনের অন্তত লাশটি। শেষবার বুকে জড়িয়ে ধরতে, বাঁধভাঙা কান্নায় শোকের পাথর সরাতে এবং চিহ্ন ধরে রাখতে একটি কবরে। কিন্তু পুড়ে অঙ্গার হয়ে চেনার অতীত দেহগুলো চিনিয়ে দেবে কে?
২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত তুবা গ্রুপের তাজরিন গার্মেন্টে চাকরি করতেন প্রায় আড়াই হাজার শ্রমিক। তাদের অনেকে এখনও নিখোঁজ। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে শোকে স্তব্ধ পুরো এলাকা। এমন করুণ মৃত্যুর দীর্ঘ মিছিলের দৃশ্য শোকাচ্ছন্ন করেছে দেশবাসীকে। এমন শোকাবহ ট্র্যাজেডিতে শোকে মুহ্যমান বাংলাদেশ। অগ্নিকাণ্ডের ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। উদ্ধারকাজ শেষে তাজরিন ফ্যাশনের দগ্ধ ভবনটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। দাফন সম্পন্ন হয়েছে শনাক্ত হওয়া লাশের। শোকবাণী, ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতিও ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু শনাক্তহীন লাশগুলো স্বজনের অপেক্ষায় ঢাকা মেডিকেলের হিমঘরে। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তা হস্তান্তর করা হবে স্বজনদের কাছে। শনিবার সন্ধ্যা থেকে উৎকণ্ঠিত অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরা। রোববার সকাল আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর থেকে শুরু হয় সন্তান হারানো মা-বাবা, বোন হারানো ভাই ও স্ত্রী হারানো স্বামীর বিরামহীন ছোটাছুটি। জীবিত না হোক, পোড়া লাশটি অন্তত চাই। তাই নিশ্চিন্তপুর পেরিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের দৌড় রাজধানীর আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের কার্যালয়ে। গতকাল নিশ্চিন্তপুর স্কুল থেকে ফ্যাক্টরির দিকে যেতে মোড়েই একটি কলোনি। টিনশেড সে কলোনিতে তাজরীন গার্মেন্টের বেঁচে যাওয়া কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সেখানে আঙিনায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলেন এক তরুণ। একপর্যায়ে তরুণটি যেচে নির্দেশনার ভঙ্গিতে বললেন, বাইরের বা স্থানীয় কারও বক্তব্য নেবেন না। তাজরীনের বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের বক্তব্য নেবেন। তার পরিচয় জানতে চাইলেও এড়িয়ে গেলেন। শ্রমিকরা জানান, তারাও ওই তরুণকে চেনেন না।
স্বজনের খোঁজে স্বজন: ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকদের স্বজনরা সারা রাত কারখানার বাইরে অপেক্ষায় থাকেন উৎকণ্ঠা নিয়ে। সকালে উদ্ধারকর্মীরা ভবনের ভেতর থেকে অগ্নিদগ্ধ লাশ বের করে জড়ো করতে থাকেন নিশ্চিন্তপুর স্কুল মাঠে। স্বজনদের আহাজারিতে এ সময় ভারি হয়ে ওঠে পরিবেশ। যখনই লাশগুলো স্কুলের বারান্দায় সারিবদ্ধ করে রাখা হয় তখনই সেখানে আপনজনদের খোঁজে আছড়ে পড়ে স্বজনরা। যারা মাঠে প্রিয়জনকে খুঁজে পাননি তারা ছুটে যাচ্ছেন ফ্যাক্টরি গেটে। হারানো স্বজনের খোঁজে অনেকে কাটিয়েছেন অনিশ্চিত সময়। কেউ কেউ তাজরিন ফ্যাশনের দগ্ধ ভবনে ঢোকার চেষ্টাও করেছেন। কণ্ঠে কান্না, চোখে অশ্রু, বুকে মাতম নিয়ে স্বজনদের এ ছোটাছুটির দৃশ্য দেখে চোখের জল ফেলেছেন অনেকেই। রংপুরের মিঠাপুকুরের আনোয়ার ইসলাম ভাগ্য ফেরাতে স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় আসেন। দু’জনই কাজ নেন আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর তাজরিন ফ্যাশনে। অগ্নিকাণ্ডের সময় আনোয়ার দ্বিতীয় ও তার স্ত্রী ষষ্ঠ তলায় কর্মরত ছিলেন। আগুন দেখে তিনি ছ’তলায় যাওয়ার চেষ্টা করলেও আশপাশের লোকজন যেতে দেয়নি। ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন স্ত্রীকে। একটি লাশ বের হয়, আর ওই কারখানারই শ্রমিক আনোয়ার প্রত্যেকের মুখের দিকে তাকিয়ে খোঁজেন স্ত্রী রেহানার মুখ। আনোয়ার জানান, ভবনের তিনটি সিঁড়ির একটি ছেলেদের ও দু’টি মেয়েদের। মেয়েদের সিঁড়ির দিকে আগুন লাগায় আটকে পড়েন তারা। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই ফ্যাক্টরির সামনে বসে আছেন তিনি স্ত্রীর অপেক্ষায়। পোড়া লাশগুলো যখন ফ্যাক্টরি থেকে বের করা হচ্ছিল তখন তিনি বারবার চেষ্টা করছিলেন দেখতে। স্কুলের বারান্দায় রাখা লাশের সারিতেও স্ত্রীর মুখ খুঁজে বেড়িয়েছেন। কিন্তু দিন শেষেও কাটেনি তার অপেক্ষার প্রহর, মেলেনি স্ত্রীর লাশ। আফরিন নামে আনোয়ারের এলাকার একটি তরুণী কাজ করতো তাজরিনে। অগ্নিকাণ্ডের পর খোঁজ নেই তার। বোনের খোঁজে রংপুর থেকে ছুটে এসেছেন ভাই আসাদুল ইসলাম। একবার কারখানার গেটে একবার স্কুল মাঠে ছুটছেন। কিন্তু দিনশেষে তিনিও খুঁজে পাননি বোনের লাশ। স্কুলের মাঠ থেকে নিলুফা নামের শ্রমিকের দগ্ধ লাশ নিয়ে ফিরছিলেন তার স্বামী ভ্যানচালক আবদুল হালিম। তিনি জানান, রাতে ডিউটিতে গিয়ে আর ফেরেননি নিলুফা। অগ্নিকাণ্ডের পর সারারাত বাইরে অপেক্ষার পর এখন স্ত্রীর পোড়া লাশ নিয়ে ফিরছেন বাড়িতে। শাহিদা নামের এক নারী ছোটাছুটি করছিলেন বোন সালমা আক্তারের লাশের খোঁজে। উদ্ধার কর্মীদের হাত-পা ধরে তিনি চাইছিলেন বোনের লাশ। সাতক্ষীরার বিলকিছকে রিকশায় জড়িয়ে ধরে আছেন তার এক প্রতিবেশী মহিলা। কাঁদতে কাঁদতে কণ্ঠস্বর ভেঙে গেছে। প্রতিবেশীটি জানান, মুন্নী নামে ছোট্ট একটি মেয়ে কর্মরত ছিল তাজরিনে। তার লাশ খুঁজতে খুঁজতে হয়রান হয়ে গেছেন তারা। পাশের এশিয়া নিটের শ্রমিক মাগুরার আতিয়ার রহমান রাত থেকে খুঁজে ফিরেছেন তার স্ত্রী শাহনাজ খাতুনের লাশ। ২০ বছর বয়সী শাহনাজ মাত্র একসপ্তাহ আগে তাজরিন ফ্যাশনে কোয়ালিটি অপারেটর হিসেবে যোগ দেন। অগ্নিকাণ্ডের দিনও স্বামী-স্ত্রী দুপুরে বাসায় একসঙ্গে খেয়েছেন। সেটাই তাদের শেষ দেখা। আগুন লাগার খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন তাজরিনের সামনে। তারপর থেকে দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে রোববার দুপুরে সরিবদ্ধ লাশের মধ্যে পাগলের মতো স্ত্রীকে। শেষে ছুটে গেছেন ঢাকায় আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামে। আতিয়ার বলেন, শাহনাজ গার্মেন্টে আর কাজ করুক তা আমি চাইনি। কিন্তু সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে ও জোর করে কাজে যোগ দিয়েছে। তাকে জীবিত হয়ত পাব না, এখন লাশটি চাই। তাদের মতো হাজারো মানুষ নিশ্চিন্তপুরে অনিশ্চিত ছোটাছুটি করেছেন রোববার দিনভর। এমন বেদনাদায়ক সময়েও উদ্ধার তৎপরতা চালাতে উৎসুক স্বজনদের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস ছুটতে হয়েছে পুলিশকে। কারণ কারখানার ভেতরে আটকা পড়া শ্রমিকদের খোঁজে দুর্ঘটনাস্থলে জড়ো হওয়া স্বজনরা উদ্ধারকাজে বিলম্বের অভিযোগে সকালেই পুলিশের ওপর ঢিল ছুড়তে শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে লাঠিপেটা ছাড়া উপায় ছিল না পুলিশের।
নিশ্চিত পুড়ে মরার চেয়ে বেঁচে থাকার অনিশ্চিত লাফ: নিশ্চিত পুড়ে মরার চেয়ে বেঁচে থাকতে ভবন থেকে অনিশ্চিত লাফ দিয়েছিলেন অনেকেই। ভবনের পুব দিকে একতলা টিনশেড ভবনের ওপর। তাদের কেউ হাত-পা ভেঙে, ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বেঁচে আছেন। কেউ মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন হাসপাতালে। সে অনিশ্চিত লাফেই অন্য পারে পাড়ি দিয়েছেন অন্তত ১০ জন। মিলি নামের একজন জানান, বেঁচে থাকতেই ঝুঁকি নিয়ে টিনের ওপর লাফ দিয়েছি। কেউ বেঁচেছি, কেউ মারা গেছে। যারা এলোমেলো ছোটাছুটি করেছে তাদের বের হতে দেরি হয়েছে। তিনি বলেন, কাজের চাপ কম থাকায় অন্যদিন ৫টায় বেশির ভাগ শ্রমিককে ছুটি দেয়া হলেও সেদিন অলস বসিয়ে রাখা হয়েছিল। শ্রমিকরা বলেন, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণার স্যাম্পল রুমের জানালার গ্রিল ভাঙতে না পারলে একজন শ্রমিকও জীবিত বের হতে পারতো না। তারা অভিযোগ করে বলেন, এক বছর ধরে বেতন-ভাতা নিয়ে সমস্যা হচ্ছিল। আন্দোলন করেই আমাদের বেতন আদায় করতে হয়েছে। রোজার ঈদের পর একসঙ্গে ৬৩ জনকে বিনা বেতনে ছাঁটাই করা হয়েছে। ঈদুল আজহার পর তেমন কাজের চাপও ছিল না।
ভয়ার্ত কণ্ঠে দুর্যোগের বর্ণনা: তাজরিন ফ্যাশনের বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের মধ্যে এক অবর্ণনীয় আতঙ্কের ছাপ। শ্রমিক মো. লিপু জানান, শুরুতেই বেজে উঠেছিল ফায়ার এলার্ম। সচকিত শ্রমিকরা বেরিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলে নিবৃত করেছে কর্মকর্তারা। এ সময় শ্রমিকদের বেশির ভাগই কর্মরত ছিলেন গার্মেন্টের দোতলার কাটিং, তেতলা ও চার তলার সুইং সেকশনে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে, কিন্তু সেখানে স্ট্রিম বা জেনারেটর বিস্ফোরণের কোন শব্দ হয়নি। তাজরিন ফ্যাশনের এক নারীকর্মী বলেছেন, আমাগো বাহির হইতে দ্যায় নাই।’ শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, এতগুলো গরিব শ্রমিক মারা গেলেও কর্মকর্তাদের কেউ হতাহত হননি। আগুনও কি একেক জনের জন্য একেক রকম আচরণ করে। নাকি তারা আমাদের আটকে রেখে নিজেরা আগে সরে গেছে। শ্রমিকরা বলেন, আগুনের লেলিহান শিখা ও দমবন্ধ কালো ধোঁয়া যখন ছড়িয়ে পড়েছে ভবনের নিচের দুই ফ্লোরে তখন জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ ছোটাছুটি করেছেন শ্রমিকরা। কিন্তু মৃত্যুই যেন গরিবি জীবনের পরম আশ্রয়। তাই ভবনের প্রশস্ত তিনটি সিঁড়িই ছিল তালাবদ্ধ। তার ওপর সব ক’টি সিঁড়ির মুখেই আগুনের লেলিহান শিখা। সিঁড়ির মুখে দাউ দাউ আগুনের আঁচে টিকতে না পেরে মুহূর্তেই উপরমুখে ঘুরে যায় পলায়নপর শ্রমিকের মিছিল। বেড়ে যায় হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি। বাঁচার তাগিদে কে কার আগে উপরে যাবে তার প্রতিযোগিতা নেয় নির্মম রূপ। এ সময় পদদলিত হয়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা ভবনের পূর্বপাশের জানালার গ্রিল ভেঙে প্রায় ১০ফুট দূরে টিনশেড একতলা বাড়ির ওপর লাফিয়ে পড়তে শুরু করে। প্রথমে কিছু শ্রমিক আহত অবস্থায় বেঁচে গেলেও টিন খসে পড়ায় বাড়ির দেয়াল ও দুই ভবনের মধ্যবর্তী দেয়ালে আছড়ে পড়ে মৃত্যুবরণ করে। বেঁচে যাওয়া শ্রমিক নাজমুল ও মিলি জানান, কিছু শ্রমিক ভবনের দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় ৩য় ও ৪র্থ তলার স্যাম্পল রুমের জানালার গ্রিল ভেঙে পাশের একটি নির্মাণাধীন দোতলা বাড়ির ছাদে নেমে যান। এ পথটিই বাঁচিয়ে দিয়েছে বেশির ভাগ শ্রমিকের জীবন। কিন্তু প্রতিটি ফ্লোরে হাতের কাছে থাকা ফায়ার ফাইটারগুলোও ছিল বিস্ময়করভাবে অব্যবহৃত। অথচ সিঁড়িতে যন্ত্রের নির্বাপক পদার্থ ছড়িয়ে দিলে বেরিয়ে যেতে পারতেন অনেকেই। বেঁচে যেতো আরও কিছু প্রাণ। মৃত্যুর মিছিলটি কিছুটা হ্রাস হতো। শ্রমিকরা জানান, রাতে ফায়ার সার্ভিসের পানি সঙ্কট হয়েছিল। তখন পাশের বাড়িগুলোর মোটর ছেড়ে পানির যোগান দেয়া হয়। উল্লেখ্য, গত ৫ই নভেম্বর কারখানায় অগ্নি-দুর্ঘটনাকালে করণীয় সম্পর্কে মহড়ার ব্যবস্থা করেছিল কর্তৃপক্ষ।
তারা বইছেন মানুষের দায়: শনিবার রাতভর আগুনে পোড়া তাজরিন গার্মেন্টকে তুবা গ্রুপ নামেই চেনে নিশ্চিন্তপুরবাসী। সেখান থেকে ভোর থেকেই উদ্ধারের পর গলিত-অর্ধগলিত লাশগুলো প্যাকেটে ঢোকানো হয়। তারপর পাশের দেওয়ান ইদ্রিস নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল মাঠে। স্কুলের বারান্দায় লাশগুলো সারিবদ্ধ করে রাখা হয় স্বজনদের শনাক্তের জন্য। আর কাজে নিয়োজিত ছিলেন নিশ্চিন্তপুরের স্থানীয় ভ্যানচালক রফিকুল ও তার সহযোগী শামীম। তারাই তাজরিন ফ্যাশন থেকে উদ্ধারকৃত লাশগুলো বয়ে নিয়ে যান স্কুল মাঠে। গলিত লাশগুলো যেন পড়ে না যায় তাই ধরে রাখে শামীম। আরেক ভ্যানচালক কাদের ও সহযোগী শফিক বয়েছেন ১৮টি লাশ। তারা জানেন না, লাশ বহনের ভাড়া পাবেন কিনা। কিন্তু ভাড়া নিয়ে তার মোটেই আক্ষেপ নেই। নিজের দায়িত্ব মনে করেই বয়ে নিচ্ছেন মৃতদেহগুলো। ভ্যানে করে আনার পথেই স্বজনরা দেখতে চায় প্যাকেটের ভেতরের লাশ। পিছু নেন ভ্যানের। তাদের সরিয়ে দেন শামীম। এ সময় পাথরের মতো মুখে রফিকুল জানান, ‘টাকা তো প্রতিদিন কামাই করি। লাশগুলো আত্মীয়-স্বজনের হাতে উঠলেই আমার পুষে যাবে।’ যেন তারা বয়ে নিচ্ছেন মানুষের দায়। কিছু লাশ স্থানীয়রা বয়ে এনেছেন হাতে ধরাধরি করে। স্কুল মাঠে লাশগুলোর তালিকা করে সেনাবাহিনী। অনেকে দাবি করেছেন তার প্রিয়জন এখানে কাজ করতো। অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তার আর খোঁজ মিলছে না। বেঁচে থাকলে তো অবশ্যই খোঁজ পাওয়া যেত। প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেন পোড়া ভবনটি ঘুরে আগুনের ভয়াবহতা দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। তার কণ্ঠে বিস্ময়াভূত মন্তব্য, ‘জানের চেয়ে মালের নিরাপত্তাই তাহলে বেশি!’ যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের কাছে বলেন, সারি সারি লাশ পড়ে আছে। এতই মর্মান্তিক দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এ মৃত্যু পাহাড়ের মতো ভারি।
নিশ্চিন্তপুরে শোকের মিছিল: রোববার সকাল থেকেই নিশ্চিন্তপুরে নেমেছিল উৎসুক মানুষের স্রোত। লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে বেলা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের নিশ্চিন্তপুর স্টেশন থেকে নিশ্চিন্তপুর গ্রামের দু’টি সড়কে ছিল মানুষের সারি। সবার গন্তব্য তাজরিন ফ্যাশন ও দেওয়ান ইদ্রিস নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সবার চোখে মুখে বেদনার ছাপ। ঘটনার ভয়াবহতায় বিচলিত ও দুঃখভারাক্রান্ত। একেবারে প্রধান সড়ক থেকে নিশ্চিন্তপুরে পা ফেলাও অসম্ভব হয়ে পড়ে। মহাসড়ক থেকে এক কিলোমিটার দূরে তাজরিন পৌঁছতে সময় লাগে আধ ঘণ্টার বেশি। বিকাল পর্যন্ত হাজারও শোকার্ত নারী-পুরুষের এ মিছিল। রাস্তায় রাস্তায় স্বজনহারাদের কান্না ও বুকফাটা আর্তনাদ। এলাকাবাসী জানায়, কখনও এত মানুষ দেখেনি নিশ্চিন্তপুরবাসী।
ট্র্যাজেডি ঘটে তবু ঘটে না বোধোদয়: তৈরী পোশাক শিল্প কারখানায় বারবার ঘটছে ট্র্যাজেটি। মর্মান্তিক সব মৃত্যুর দৃশ্যায়ন। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে কাজ করতে আসা নিম্ন আয়ের সাধারণ নারী শ্রমিকরা বাড়ি ফিরছেন লাশ হয়ে। অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার এলার্ম বাজে কিন্তু ভবন ছাড়তে পারে না শ্রমিকরা। ভবনে বিকল্প সিঁড়ি থাকলেও তা থাকে তালাবদ্ধ। ফায়ার ফাইটার থাকলেও সেগুলোর ব্যবহার হয় না। বিজিএমইএ ও বিভিন্ন সংগঠনের দেয়া তথ্য মতেই, দুই দশকে গার্মেন্টে আগুনের ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন ৭০০ শ্রমিক। যদিও শ্রমিক সংগঠনের দাবি এ সংখ্যা অন্তত তিনগুণ। তাজরিন ফ্যাশনই বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্পে জানের ক্ষয়ে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। অসচেতনতা আর মালিকদের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে কিছুতেই থামছে না এমন দুর্ঘটনা। বড় কোন ঘটনার পর টনক নড়ে সংশ্লিষ্টদের। গঠন করা হয় তদন্ত কমিটিও। কিন্তু মাছের মায়ের পুত্রশোক দ্রুতই হারিয়ে যায়। কেবল গার্মেন্ট মালিক প্রতিষ্ঠানের সামান্য কিছু অর্থ সাহায্যই তাদের শেষপ্রাপ্য। তুবা গ্রুপের প্রধান আমদানিকারক ওয়াল মার্ট এ প্রতিষ্ঠানকে রেখেছিল অরেঞ্জ তালিকায়। প্রশ্ন তুলেছিল পরিবেশগত ত্রুটির। কর্মস্থলের পরিবেশ অতিরিক্ত খারাপ হলে ওই প্রতিষ্ঠানকে ‘লাল’ তালিকায় রাখে তারা। পরপর দুই বছর ‘অরেঞ্জ’ রেটিং পেলেও ওই প্রতিষ্ঠান ‘লাল’ তালিকায় চলে যায়। কিন্তু সেদিকে কি নজর দিয়েছিল কর্তৃপক্ষ? এখন সেগুলো কেবল প্রশ্ন আর আফসোসের কারণ। তাজরনি ফ্যাশন এখন পোড়া শ্মশান, সেখানকার ১১০জন শ্রমিক না ফেরার দেশে। শ্রমিক সংগঠনগুলো এমন মৃত্যুকে ‘স্বেচ্ছাকৃত অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড’ দাবি করলেও মালিক সংগঠন তা উড়িয়ে দিচ্ছেন স্রেফ দুর্ঘটনা বলে। কোটি কোটি টাকার সম্পদ হারানোর বেদনাই তাদের কণ্ঠে মুখ্য হয়ে ঝরছে। সে সম্পদ যাদের শ্রমে সে শ্রমিকদের প্রাণহানী নিয়ে কোন বেদনাবোধ নেই চেহারায়। নিহত শ্রমিকদের স্মরণে একদিনের শোক ঘোষণা করেছে সরকার। কিন্তু এ শোক নিহত শ্রমিকদের ‘নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’ পরিবারকে কি দেবে। যাদের কাছে প্রতীকী সম্মানের চেয়ে দু’বেলা দু’মুঠো অন্নের যোগানই মুখ্য।
ছয় কারণে এত প্রাণহানি: ছাদে ওঠার গেট বন্ধ থাকা, নিচে নামার একটি গেট বন্ধ করে রাখা, তিনতলার ফ্লোর গেট বন্ধ থাকা, অ্যালার্ম বাজার পরও শ্রমিকদের বেরুতে না দেয়া, আগুন লাগার এক ঘণ্টা পরও শ্রমিকদের না জানানো ও নিচে নামার দুই সিঁড়ির মাঝখানে গুদাম বানানো- তানজির ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডে এত প্রাণহানির পেছনে ওই ছয়টি কারণের কথাই উঠে এসেছে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে। অগ্নিকাণ্ডের সময় ছাদে ওঠার গেটটি বন্ধ ছিল। আগুন লাগার সময় শ্রমিকরা ছাদে উঠতে পারলে ফায়ার ব্রিগেড মই দিয়ে ছাদ থেকে শ্রমিকদের নামিয়ে আনতে পারতো। এর আগে অন্যান্য জায়গায় আগুনের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ছাদ থেকে লোক নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু এখানে কোন শ্রমিক ছাদে যেতে পারেনি। ওই কারখানায় শ্রমিকদের নিচে বেরিয়ে আসার সিঁড়ি ২টি। দুর্ঘটনার সময় একটি সিঁড়ির কলাপসিবল গেটে তালা লাগানো ছিল। শ্রমিকদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সবচেয়ে বেশি শ্রমিক মারা গেছে তিনতলা ও চারতলায় অগ্নিকাণ্ডের সময়। ওই দুটি ফ্লোরের গেট বন্ধ ছিল। কোন শ্রমিক ফ্লোর থেকে বেরুতে পারেনি। যারা বেঁচে আছে তাদেরকে বেরুতে হয়েছে জানালা ভেঙে লাফিয়ে। আহত একাধিক শ্রমিক জানিয়েছেন, প্রথম ফায়ার অ্যালার্ম বাজে ৬টা ৪৫ মিনিটে। সে সময়ে শ্রমিকরা বেরুতে চাইলেও বিভিন্ন ফ্লোরের ইনচার্জ ও প্রোডাকশন ম্যানেজাররা শ্রমিকদের বেরুতে দেননি। ৬টা ৪৫ মিনিটে অ্যালার্ম বাজলেও মূল আগুন ছড়িয়ে পড়ে ৭টার দিকে। মাঝে এক ঘণ্টা সময় অনায়াসে বেরিয়ে আসতে পারতো শ্রমিকরা কিন্তু গার্মেন্ট কর্তৃপক্ষ সেটা দেয়নি। নিচতলায় কর্মরত একজন শ্রমিক জানিয়েছেন, ৬টা ৪৫ মিনিটে ফায়ার অ্যালার্ম বাজলেও আসলে নিচতলার গুদামে আগুন লাগে আরও আগে, ৬টার দিকে। প্রথমে নিচতলায় কর্মরত সিকিউরিটি গার্ডরা নিজেরা আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তারা কারখানার কোন ফায়ার ডিস্টুংগিউসর ব্যবহার করেনি। আগুন নেভাতে না পেরে তারা ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয় এবং অ্যালার্ম বাজায় কিন্তু ওপরের কোন ফ্লোরে আগুনের খবর দেয়নি। জানা গেছে, মালিকের ঢাকায় আরও ৬টি গার্মেন্ট আছে। তার সবগুলো গার্মেন্টের গুদামই এখানে। এখানে গুদাম করা হয়েছে শ্রমিকদের বেরিয়ে আসার দুটি সিঁড়ির মাঝখানে। গুদামে আগুন লাগার কারণে শ্রমিকরা বেরুতে পারেনি।

No comments:

Post a Comment