টক অব দ্য টাউন ওসি সিদ্ধিরগঞ্জ
আবারও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি কামরুল আলম মোল্লাকে নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে ঘুষবাণিজ্য আর দুর্নীতির কারণে আলোচিত হলেও এবার তিনি বউ পিটিয়ে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। শুধু তাই নয়। আহত স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে গভীর রাতে বের করে দিয়ে বাসায় তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। তারা পরিবারের কারও সঙ্গে যাতে যোগাযোগ করতে না পারেন এ জন্য স্ত্রীর হাত থেকে মুঠোফোনটিও কেড়ে নিয়েছেন ওসি কামরুল। আহত স্ত্রী রেহানা পারভীন নিরুপায় হয়ে থানা কার্যালয়ের পাশে একটি চায়ের দোকানে বসে রাত পার করেন। অন্যদিকে ওসি কামরুল আলম মোল্লা গভীর রাতে অজ্ঞাত স্থানে গিয়ে রাত কাটান। যাওয়ার সময় ঘটনাটি যাতে প্রকাশ না পায় সে জন্য নজরদারি বাড়িয়ে যান। কিন্তু ওসির ন্যক্কারজনক আচরণে থানার একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবলদের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। বুধবার রাতে থানা কোয়ার্টারের ভেতর ওসির এহেন ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে স্ত্রী রেহানা পারভীনের ওসি’র গোপনে আরেকটি বিয়ে নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন। নির্যাতিত রেহানা পারভীন বৃহস্পতিবার এসপি’র সঙ্গে দেখা করে বিস্তারিত ঘটনা জানান। এদিকে এ ঘটনার পর থেকে সিদ্ধিরগঞ্জে টক অব দ্য টাউন এখন ওসি কামরুল।
ঘটনার সূত্রপাত: সূত্রমতে, ওসি কামরুল আলম মোল্লার নারীঘটিত ব্যাপারসহ নানা বিষয় নিয়ে গত কয়েক মাস ধরে তাদের দাম্পত্য জীবনে অশান্তি নেমে আসে। থানার ভেতর কোয়ার্টারে রাত যাপনের কথা বলে রাতে তিনি অন্যত্র থাকতেন। ঠিকমতো ঢাকার বাসায় যেতেন না। এমনকি গত ৪ মাস ধরে দুই ছেলেমেয়ের খরচও দিচ্ছেন না। দুই মাস আগে গোপনে মুনমুন নামে এক মহিলাকে বিয়ে করেন। এসব বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ জানান স্ত্রী রেহানা পারভীন। তাছাড়া, ওসি অসুস্থ হয়ে ৫-৬ দিন হাসপাতালে থাকলেও ছুটি কাটিয়েছেন ১৯ দিন। কিন্তু তিনি বাসায়ও ছিলেন না। এক পর্যায়ে কোরবানির ঈদের আগের দিন ঢাকার বাসা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কার্যালয়ে গিয়ে হৈচৈ করেন রেহানা পারভীন।
থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্য মানবজমিনকে জানান, বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কম্পাউন্ডে অবস্থিত ওসি’র কোয়ার্টারে স্ত্রীকে বেধড়ক পিটিয়ে পুত্র সন্তানসহ বাসা থেকে বের করে বাসাটি তালাবদ্ধ করে ওসি কামরুল অজ্ঞাত স্থানে চলে যান। এর আগে স্ত্রীর মুঠোফোনটিও কেড়ে নেন। এই ঘটনায় থানায় অবস্থানরত পুলিশ সদস্য ও অন্যদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ওসি’র স্ত্রী ও পুত্রের কান্না শুনে কয়েকজন পুলিশ সদস্য তাদের দু’জনকে নিয়ে থানার পার্শ্ববর্তী একটি চায়ের স্টলে বসান। আহত অবস্থায় ওসি’র স্ত্রী সারারাত থানা কার্যালয়ের পাশে অবস্থিত ওই চায়ের স্টলে বসে ছিলেন। সকালে নারায়ণগঞ্জ শহর থেকে একজন আত্মীয় এসে তাদের দু’জনকে নিয়ে যান। শহরের একটি ক্লিনিকে রেহানা পারভীনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তার আত্মীয় এক গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা ঢাকা থেকে ঘটনাটি জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের টেলিফোনে জানান। রেহানা পারভীন মানবজমিনকে বলেন, পুলিশ পরিদর্শক কামরুল তার অমতে দুই মাস আগে দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। এর প্রতিবাদ করায় তাকে নানা ভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে আসছে।
ওসির গোপন নিবাস: সূত্রমতে, ঢাকার রামপুরার বনশ্রীতে ওসি কামরুল জি ব্লকের ১ নং সড়কের ২৫ নং বাড়ির ৪-এ নং ফ্ল্যাটটি মাসিক ২০ হাজার টাকায় ভাড়া নেন গত ১লা আগস্ট থেকে। বাড়িওয়ালার সঙ্গে চুক্তিপত্রে তিনি নিজের নাম লিখেছেন কামরুল ইসলাম মোল্লা। পিতার নাম শামসুল আলম মোল্লা হলেও লিখেছেন তোফাজ্জল হোসেন। ওসি’র গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ জেলার ইচাখালী চুক্তিপত্রে লিখেছেন ৪৭/১, নিউ চাষাঢ়া, জামতলা, নারায়ণগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানা লিখেছেন ৩৭ নং ঈশা খাঁ রোড, নারায়ণগঞ্জ। স্ত্রী রেহানা পারভীন কন্যা, পুত্র সহ ঢাকায় ফার্মগেট এলাকায় বসবাস করেন। ওসি কামরুল ২০১২ সালের ২৪শে আগস্ট মুনমুন নামের এক মহিলাকে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করেন ১ লাখ টাকা দেনমোহরে (কাবিননামা অনুযায়ী)। মুনমুন গত ২১ থেকে ২৫শে জুন নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে আটক ছিলেন একটি প্রতারণা মামলায়। সি আর মামলা নং-৩৭৩/১২, ধারা দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০, ৩৮০, ১৮০। মুনমুন কারাগারে থাকাকালে ওসি কামরুল স্বামী পরিচয়ে কারাগারে জেলারের সঙ্গে দেখা করেন এবং খোঁজখবর নেন। নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও গোপালগঞ্জের লোক হওয়ায় ওসি কামরুলের বিরুদ্ধে জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা কোন কথা বলতে সাহস পান না বলে জানা গেছে। টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে ওসি কামরুল তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বুধবার রাতে স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক বিষয় নিয়ে তার ঝগড়া হয়েছিল। সকালে স্ত্রী ঢাকার বাসায় চলে গেছে। স্ত্রীকে তিনি কোন নির্যাতন করেন নি। জেলা পুলিশ সুপার শেখ নাজমুল আলম বলেন, ওসি কামরুলের স্ত্রী দুপুরে আমার সঙ্গে অফিসে দেখা করেছেন। বিষয়টি পারিবারিক হওয়ায় তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলার জন্য ওসিকে বলেছি।
No comments:
Post a Comment