Pages

Thursday, November 15, 2012

বিনিয়োগ নেই, তাই বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ

বিনিয়োগ নেই, তাই বাড়ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ 

দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি নিয়ে বেশ উচ্চবাচ্য হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিনিয়োগ মন্দাসহ বেশকিছু কারণ রয়েছে এই রিজার্ভ বৃদ্ধির নেপথ্যে। গ্যাস-বিদ্যুত্ সমস্যা, ব্যাংক ঋণে সুদের হার চড়া হওয়ায় বিনিয়োগ ক্রমাগত কমছে। আর বিনিয়োগ না হওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিও কমে যাচ্ছে। এতে আমদানি খরচ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেও তা দেশের জন্য তেমন উপকারে আসছে না। বৈদেশিক মুদ্রা উত্পাদনশীল খাতে ব্যবহার না হওয়ায় তা মূল্যস্ফীতিকেও অনেকাংশে উস্কে দিচ্ছে বলে তাদের অভিমত। নিয়ম অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার একটা বড় অংশ অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রবাহ আকারে বাজারে ছাড়া হয়। যা উত্পাদনশীল খাতে ব্যবহূত হয়। কিন্তু দেশে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রয়েছে তা কোন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে না। আর অলসভাবে এই টাকা পড়ে থাকায় ‘টাইম ভেলু অব মানি’র কারণে এক সময় এ অর্থের পরিমাণ কমে যাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন এজন্য এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে এ রিজার্ভকে কিভাবে উত্পাদনশীল খাতে কাজে লাগানো যায়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশি থাকা অবশ্যই ভাল। তবে রিজার্ভ উত্পাদনশীল কাজে ব্যবহার করতে না পারলে তা তেমন লাভ পাওয়া যাবে না। আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় উত্স হচ্ছে রেমিট্যান্স। কিন্তু রেমিট্যান্স যারা পাঠাচ্ছে তারা সেটাকে উত্পাদনমুখি কাজে না লাগিয়ে বাড়ি-ঘর তৈরি বা জমি কেনার কাজে ব্যবহার করছে। তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা উত্পাদনমুখি কাজে না লাগিয়ে ভোগ্যপণ্যে ব্যবহার করায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, দফায় দফায় গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি এসবের তীব্র সঙ্কটে শিল্প-কারখানার উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় শিল্পের খরচও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে আমাদের শিল্প উদ্যোক্তারা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। তিনি বলেন, একদিকে অবকাঠামোগত ত্রুটি অপরদিকে ব্যাংকের উচ্চ সুদহারের কারণে বিনিয়োগ নিরুত্সাহিত হচ্ছে। আর বিনিয়োগ না হওয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি কমছে এতে বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে।
জানা গেছে, দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১২ বিলিয়ন (এক হাজার ২০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক আমদানি ব্যয় পরিশোধ বাবদ এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিটে (আকু) ৬৮ কোটি ডলার পরিশোধ করায় রিজার্ভ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে রিভার্ভের পরিমাণ ১১ দশমিক ৬৩২ মিলিয়ন ডলার দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূচকের সর্বশেষ ধারা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রেমিট্যান্স ছাড়া বেশিরভাগ সূচকের প্রবৃদ্ধিই কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করলেও বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে তেমন ভূমিকা রাখতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের রাজস্ব আয় বেড়েছে। তবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ কম হওয়াতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারকে প্রচুর পরিমাণ ঋণ নিতে হয়েছে। যার বেশিরভাগই বিদ্যুত্-জ্বালানি খাতে ভর্তুকি হিসাবে গেছে। সরকারের বেশি ঋণের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের গতি কমেছে। সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসের তুলনায় দ্বিতীয় মাসে (আগস্ট) ঋণ প্রবাহ ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯ দশমিক ৯৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাই মাসে ছয় হাজার ৮৯৭ কোটি টাকা বিতরণ করা হলেও আগস্ট মাসে ছয় হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা বিতরণ হয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগই মূল বিনিয়োগ হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু বর্তমান সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২১ সালে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। আর পঞ্চবার্ষিকী (২০১১-১৪) পরিকল্পনার লক্ষ্যমাত্রা থেকেও বিনিয়োগ অনেকখানি পিছনে রয়েছে। এরমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগও আশানুরূপ হয়নি। এজন্য স্বয়ং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে বলেছেন, বিগত সাড়ে তিন বছরে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে না পারা আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। বিগত এক যুগে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ ভালো ছিল। গত বছরে এক দশমিক এক বিলিয়ন বিনিয়োগ হয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এটি আশানুরূপ নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আর্থিক খাতের অব্যবস্থাপনার কারণে বিনিয়োগকারী অনেক ক্ষেত্রে পিছু হটছেন। তারা বলছেন, শেয়ারবাজার কারসাজি, হলমার্ক কেলেংকারি, সরকারি কাজে ব্যাংক ঋণের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে অনেক বিনিয়োগ উপযোগী মূলধন বিনিয়োগের বাইরে থেকে গেছে।
বিনিয়োগের অন্যতম নিদর্শন মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে, আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ক্রমেই কমছে। একইসঙ্গে যে পরিমাণ এলসি খোলা হচ্ছে তার সবগুলো নিষ্পত্তিও হচ্ছে না। এতে দেশে নিত্যপণ্যসহ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিও কমে যাচ্ছে। এলসি খুলতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর অনাগ্রহ প্রকাশ, কিছু ক্ষেত্রে ভোগ্যপণ্যের চাহিদা কম থাকা এবং সর্বোপরি বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে পরিস্থিতি এমন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৮৭৪ কোটি ৮২ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যমানের পণ্য আমদানির জন্য এলসি খোলা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৯৮১ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার। ফলে আগের একই সময়ের তুলনায় এলসির মূল্য কমেছে ১০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে এলসি নিষ্পত্তির মূল্যও একই সময়ে কমেছে ৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। সাধারণত এলসি নিষ্পত্তি ও প্রকৃত আমদানি মোটামুটি কাছাকাছি হলেও এবার তার ব্যতিক্রম দেখা গেছে।
বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-বিদ্যুত্ সঙ্কট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও উচ্চমূল্যস্ফীতির পরও ব্যবসায়ীরা কোনমতে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকের উচ্চসুদহারের সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সার্বিকভাবে এসব কারণে নতুন করে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা উত্সাহিত হচ্ছেন না। চলতি বছরের প্রথম দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সব ধরনের ব্যাংকঋণে সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা (ক্যাপ) প্রত্যাহার করে নেয়। ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে পরে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সেখানে ব্যাংকের ঋণ ও আমানতে সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) নিম্নতর এক অংক তথা ৫ শতাংশীয় পয়েন্টে সীমিত রাখতে বলা হয়। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সে নির্দেশনা না মেনে নানা অযুহাতে শিল্পাদ্যোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুদ আদায় করছে।

 

No comments:

Post a Comment