পোশাকশ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের (৪১) সন্দেহভাজন খুনির সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) দুই কর্মকর্তার যোগাযোগের প্রমাণ পেয়েছেন এ ঘটনার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এর সূত্র ধরে তাঁরা এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করেছেন।
৩ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাঞ্চল্যকর মামলা তদারকি সেলের ৭১তম সভায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ তথ্য উপস্থাপন করে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর এতে সভাপতিত্ব করেন।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এনএসআইয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আমিনুল ইসলাম বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) সংগঠক ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের নেতা ছিলেন। গত ৪ এপ্রিল আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হওয়ার পরদিন তাঁর ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায় টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাসূত্র জানায়, পুলিশের প্রতিবেদনে সন্দেহভাজন খুনির সঙ্গে এনএসআই কর্মকর্তাদের যোগাযোগ রয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে এনএসআই কর্মকর্তারা আমিনুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত কি না, তা প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এতে বলা হয়, আমিনুল খুন হওয়ার আগে ও পরে তাঁর সন্দেহভাজন খুনি মোস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে এনএসআইয়ের দুই কর্মকর্তা মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেন। ওই মুঠোফোন নম্বর দুটি ব্যবহার করেন এনএসআইয়ের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ ও মাঠ কর্মকর্তা লুৎফর রহমান।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকে মোস্তাফিজ পলাতক। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও টাঙ্গাইল জেলা গোয়েন্দা পরিদর্শক হুমায়ুন কবির আকন্দ এ ঘটনায় এনএসআইয়ের প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে ওই দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার হাফিজ আক্তার জিজ্ঞাসাবাদের কথা স্বীকার করেন। তবে এই দুই কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, সদর দপ্তরের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনো কথা বলবেন না।
টাঙ্গাইল জেলার পুলিশ জানায়, বেওয়ারিশ হিসেবে আমিনুলের লাশ উদ্ধারের পর ঘাটাইল থানার উপপরিদর্শক শাহীন মিয়া অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন। পরে আমিনুলের ভাই রফিকুল ইসলাম এ ঘটনায় সন্দেহভাজন মোস্তাফিজুর রহমান ও বোরকা পরিহিত অজ্ঞাতনামা এক নারীকে আসামি করে ঘাটাইল থানায় আরেকটি এজাহার দেন।
ওই এজাহারটি পুলিশের করা হত্যা মামলার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে সিআইডি।
আমিনুল খুনের ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তৈরি পোশাক ক্রয়কারী ইউরোপ, আমেরিকা ও কানাডার ১২টি সংগঠন প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ব্যাপারে চিঠিও দেয়। বিসিডব্লিউএসের নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে এনএসআইয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত।
আমিনুলের সহকর্মী বাবুল আক্তার অভিযোগ করেন, এর আগে ২০১০ সালের ১৮ জুন রাজধানীর রমনা এলাকা থেকে আমিনুলকে তুলে নিয়ে যায় এনএসআই। ওই দিন তাদের হাত থেকে কৌশলে পালিয়ে আসেন তিনি। এরপর চলতি বছরের ৯ মার্চ বিসিডব্লিউএসের অফিস থেকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁকে ধরে নিয়ে যায় শিল্প পুলিশ। তখন শিল্প পুলিশের শ্রীপুরের কার্যালয় থেকে মুচলেকা দিয়ে আমিনুলকে ছাড়িয়ে আনেন বাবুল আক্তার। মুচলেকায় লেখা ছিল, ১২ মার্চ সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমিনুলকে শিল্প পুলিশের কার্যালয়ে বসে থাকতে হবে। ১২ মার্চ বিএনপির মহাসমাবেশে আমিনুল ১০ হাজার লোক দেবেন, এনএসআইয়ের এমন খবরের ভিত্তিতে শিল্প পুলিশ তাঁকে আটকে রাখে বলে বাবুল আক্তার জানান। তিনি বলেন, বরাবরই গোয়েন্দা সংস্থা থেকে আমিনুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছিল, শ্রমিকদের দাবির নামে তিনি পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করছেন।
আমিনুল হত্যা তদন্তে গত ১৬ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইন উদ্দিন খন্দকারকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির প্রতিবেদনে মোস্তাফিজুরকে সন্দেহভাজন হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, ‘তাঁর মোবাইল ফোনের কল-তালিকা পরীক্ষা করলে অনেক তথ্য বের হয়ে আসতে পারে।’
প্রথম আলোর মাগুরা প্রতিনিধি কয়েক দিন আগে মোস্তাফিজুরের গ্রামের বাড়ি শ্রীপুর উপজেলার রাধানগরের কাধিরপাড়া গ্রামে গেলে মোস্তাফিজুরের সত্তরোর্ধ্ব বাবা শমসের মল্লিক বলেন, ‘বেশ কিছুদিন আগে মোস্তাফিজুর গ্রামের বাড়িতে এসেছিল। কয়েক দিন থেকে চলে গেছে।’ ঢাকায় মোস্তাফিজ কোথায় থাকেন, বিয়ে করেছেন কি না, এসব খবর জানেন না তাঁর বাবা। মোস্তাফিজুরের খোঁজে পুলিশের দলও একাধিকবার এলাকায় যায়। স্থানীয় থানাকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার হাফিজ আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, আমিনুল হত্যা মামলা তদন্ত করতে গিয়ে জেলা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পারেন, সন্দেহভাজন মোস্তাফিজুর রহমান ছিলেন এনএসআইয়ের সোর্স। এনএসআই কর্মকর্তারাও প্রথম আলোর কাছে তা স্বীকার করেন। পলাতক থাকা অবস্থায় মোস্তাফিজুর এনএসআইয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা জানতে পারেন, মোস্তাফিজ কুইন্স সাউথ নামে একটি কারখানা থেকে ২০০৯ সালে চাকরি হারান। এরপর কোথাও চাকরি করেননি। বেপজার মেডিকেল সেন্টারের কর্মী হিসেবে তিনি বেতন পেতেন।
জানতে চাইলে বেপজার মহাব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মোস্তাফিজুর বেপজার মেডিকেল সেন্টারে দৈনিক বেতনভূক কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। মাঝেমধ্যে তিনি বিভিন্ন কারখানার গোপন খবর তাঁকে জানাতেন।
আমিনুল নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা ফাহিমা দাবি করে আসছিলেন, সরকারি কোনো সংস্থার গুপ্তহত্যার শিকার হয়েছেন তাঁর স্বামী।
জানতে চাইলে এনএসআইয়ের একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, আমিনুল হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনমতো কথা বলার জন্য পুলিশকে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করার জন্য এনএসআই কর্মকর্তাদেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
No comments:
Post a Comment