মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফিরছেন শূন্য হাতে, কাজ থেকে ধরে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে, বিমানবন্দরে কান্না
লাখ লাখ টাকা খরচ। গিয়েছিলেন আয়-উপার্জনের আশায়। আয়ের মুখ তো দেখেনইনি, উল্টো ফিরছেন দলে দলে- একেবারেই শূন্য হাতে। কারও কাছে বাড়ি পৌঁছার বাস ভাড়াও নেই। সাহায্য নিচ্ছেন সফরসঙ্গীর কাছ থেকে। গায়ের কাপড় ছাড়া আর কোন সম্বল সঙ্গে নেই অনেকের। তবে সবারই সম্বল আছে একটি- কান্না। যারা দেশের জন্য রেমিটেন্স পাঠাতে গেছেন স্বজন ছেড়ে, রাস্তায় বা মরুভূমির খোলা ময়দানে থেকেছেন তারা দিনের পর দিন, জেল খেটেছেন মাসের পর মাস- তাদের কোন অপরাধ না থাকলেও কাজ থেকে ধরে পাঠিয়ে দেয়া হয় দেশে। ওখানে কপালে কাজ জোটে না। চাকরিও নেই। না খেয়ে, না পরে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন তারা। পুলিশ আর মালিকদের অমানবিক নির্যাতনে প্রাণ যায় যায় অবস্থা ছিল। মন ও শরীরের ওপর এত ধকলের পর তবুও সান্ত্বনা খুঁজছেন তারা। হাজার কষ্টের পর হোক, দেশে তো ফিরেছেন। এরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরা বাংলাদেশী। শ্রমিক হিসেবে গিয়েছিলেন সেখানকার বিভিন্ন দেশে। তাদের প্রায় সবাই দেশে ফিরে আসছেন একেবারে। তারা জানান, এখনও দেশগুলোর কারাগারে আছেন কয়েক লাখ বাংলাদেশী। সেখানে অবস্থানকারী শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষা, দুর্দশার প্রতিকারে কিংবা কারাগারে আটকদের জন্য কোন ভূমিকাই পালন করছে না বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো। এরা যখন হযরত শাহজালাল (রহ.) বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফিরছিলেন, তখন কারও মুখে হাসি ছিল না। স্বজনদের সঙ্গে দেখা হলেও হাসিমুখে কথা বলতে পারেননি। কেঁদেছেন অঝোরে। ঘরে ফেরা শ্রমিকদের চোখে-মুখে ছিল সর্বস্ব হারানো বেদনার ছাপ। যে টাকা খরচ করে গিয়েছিলেন তার সিকি ভাগও উপার্জন করতে পারেননি। এভাবে ফেরার কথা ছিল না তাদের। কিন্তু ফিরছেন। আর যাওয়া হবে না। সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে তাদের। প্রতারিত হয়েছেন নিয়োগকারী কোম্পানির কাছ থেকে। এমনকি সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকেও চাকরিচ্যুত করা হয়েছে শ্রমিকদের। অন্য দেশগুলোর প্রতি সুবিচার দেখানো হলেও বাংলাদেশীদের জন্য কোনই সহানুভূতি দেখাচ্ছে না আরব বিশ্বের দেশগুলো। এজন্য বাংলাদেশ সরকারও কোন ভূমিকা পালন করছে না। ফলে প্রতিদিনই রেমিটেন্স পাঠানো এসব মানুষের ঘরে ফেরার সংখ্যা বাড়ছে।
গতকাল যখন বিমানবন্দরের বাইরে তাদের সঙ্গে কথা হয়, তখন অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। চোখের পানি চেষ্টা করেও আটকাতে পারেননি। জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশী শ্রমিকরা সুখে নেই। তাদের মধ্যে চলছে মাতম। চাকরি হারানো, পাওনা টাকা না পাওয়া, সুযোগ থাকার পরও বাংলাদেশীদের কাজ করতে না দেয়া, সরকারি ভাবে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, অবহেলা আর নির্যাতন- এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানবজমিনকে তারা জানান, খরচের টাকা সুদে নিয়ে গিয়েছিলেন অনেকেই। উদ্দেশ্য ছিল, দেনা শোধ করে সংসারে সুখ আনবেন। তাই দূর পরবাসে থেকেছেন বছরের পর বছর। কিন্তু সুদে নেয়া সেই টাকা আর শোধ হয়নি। বরং পরিশোধ না করায় দেনার পরিমাণ বেড়েছে কেবল। তাই দেশে ফিরলেও তারা এখন রীতিমতো চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন। বিমান থেকে নেমেই তাই বললেন কেউ কেউ- কি হবে এখন জানি না।
সুখের খোঁজে যাওয়া এসব মানুষের চোখে এত হতাশা কেন? কান্নাই বা কেন তাদের একমাত্র সম্বল? কেন এত ক্ষোভ? তারা নিজেরাই দিয়েছেন এর উত্তর। বিমানবন্দরে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে সৌদি আরব, দুবাই, ওমান, কাতার, বাহরাইন, জর্দান থেকে সব হারিয়ে দেশে ফেরা মানুষের স্রোতই বেশি। যে বিমানে করে তারা আসছেন তাতে কোন সিটই ফাঁকা থাকছে না। কিন্তু ওই একই বিমান যাওয়ার সময় অর্ধেক যাত্রী গন্তব্যে নিয়ে যেতে পারছে না। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঢাকায় আসা চারটি আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের প্রায় সব যাত্রী ছিলেন মধ্যপ্রাচ্য থেকে ফেরা। বিমানবন্দরে এদের যে ক’জনের সঙ্গে আলাপ হয়, তাদের বেশির ভাগকে একেবারে চলে আসতে হয়েছে। আবার ফিরবেন এমন যাত্রীর সংখ্যা একেবারেই কম।
সকাল ১১টায় এয়ার দুবাইয়ের ফ্লাইটে এসেছেন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার নর কতমপুরের ইউনূস। ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে দুবাই গিয়েছিলেন দেড় বছর আগে। ডকলেন কোম্পানি নামে একটি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য যাওয়া। গত ৭ মাস ধরে কোম্পানি তাকে দিয়ে কাজ করালেও কোন বেতন দিচ্ছিল না। এক সময় তাকে উল্টো ধরিয়ে দেয়া হয় পুলিশে। বলা হলো সে অবৈধ। পুলিশ অভিযোগ নিলো কিন্তু তা সত্য কিনা বিবেচনায় না নিয়ে কারাগারে পাঠানো হলো। সেখানে ১ মাস ১৩ দিন জেল খেটে তিনি দেশে ফিরেছেন। এজন্য দেশ থেকে টিকিটের ১৩,০০০ টাকা পাঠাতে হয়েছে। ঢাকা পৌঁছে বাড়ি যাওয়ার পয়সা নেই তার। সফরসঙ্গীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি যাবেন। বললেন, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশকে এখন আর কেউই ভাল চোখে দেখছে না। নানা কারণে এদেশের শ্রমিকদের ওপর তাদের বিরক্তি। সুযোগ পেলেই নির্যাতন করা হচ্ছে। তার মতে, সেখানে কারাগারগুলোতে বিদেশীদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই বাংলাদেশী। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। কিন্তু ধরে নিয়ে জেলে রেখে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশে। এমনকি ছুটিতে আসা শ্রমিকদেরও এয়ারপোর্ট থেকে ধরে নিয়ে জেল খাটিয়ে একেবারে বিদায় করে দেয়া হচ্ছে। এখনও শুধু দুবাইয়ের বিভিন্ন জেলে আটক আছেন ২০,০০০ থেকে ৩০,০০০ বাংলাদেশী শ্রমিক। জেলে যেমন শারীরিক নির্যাতন করা হয় তেমনি রাখা হয় মানসিক চাপেও। দুই বেলা পাতলা রুটি এবং একবেলা ডাল আর ঝোল দেয়া হয়। টিকিটের পয়সা নেই বললে চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। দেশ থেকে টাকা আনতে দেরি হলে কারাগারে গিয়ে পুলিশ নির্বিচারে পেটায়। তিনি জানান, যে ফ্লাইটে এসেছেন, তার সঙ্গে আসা শ্রমিকদের মধ্যে জেল খেটে এসেছেন ৩০ জন। তারা একই সঙ্গে ছিলেন। ওই ফ্লাইটে আসা মাদারীপুর সদর উপজেলার কুন্তিপাড়ার বাসিন্দা বেলাল আহমদ কাজ করতেন ডায়মন্ড অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ফার্মে। তিনি রঙের কাজ করতেন। তাকে যেদিন পুলিশ ধরে আনে সেদিন সাতুয়া এলাকায় কাজে ছিলেন। তার পোশাকে তখনও রঙ লাগানো ছিল। জোর করে তাকে কোন কারণ ছাড়াই আটক করা হয়। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আউট পাস দিতে দেরি হওয়ায় ২৪ দিন জেল খেটেছেন। তিনি জানান, তার চেনা ৪ বৈধ শ্রমিককে বাস থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পাসপোর্ট সঙ্গে না থাকার অপরাধে পুলিশ বেল্ট দিয়ে পিটিয়েছে। পরে জেল দিয়ে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এমন হাজারো ঘটনা ঘটছে। এ মুহূর্তে বৈধ হয়েও প্রায় লুকিয়ে কাজ করছেন বাংলাদেশী শ্রমিকরা। তাদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশীদের এই অবস্থা উত্তরণে ভূমিকা রাখতে পারতো সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা। কিন্তু তার কোন প্রমাণ পাচ্ছেন না শ্রমিকরা। ফলে সেখানে অবস্থানকারীদের মাঝে হতাশা বাড়ছে। এয়ার এরাবিয়ানে দেশে ফেরা যাত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার দুর্জয়নগর গ্রামের আবুল কালাম জানান, সেখানে যাওয়ার পর অনেক কোম্পানি পাসপোর্ট নিয়ে যায়। ধরা পড়লে কোন অজুহাতই আমলে নেয় না পুলিশ। কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ হলে জানানো হয় পাসপোর্ট তারা নেয়নি। ‘আনা মাফি মালুম’ (আমি কিছু জানি না) বলে পুলিশের কাছে দাবি করে। তখন অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয় না। তারা একতরফা দায়ী করে বাংলাদেশী শ্রমিকদের। তিনি তার এলাকার কসবা উপজেলার আলমগীর নামের একজনের কথা জানান যার পাসপোর্ট কোম্পানি গায়েব করে দিয়েছে। তিনি এখন পালিয়ে আছেন। আবুল কালাম বলেন, দুবাইর শারজার আল উর্দুন ক্লিনার কোম্পানির মাধ্যমে যাই। সেখানে কাজ করতাম সরকারি প্রতিষ্ঠানে। কোন কারণ ছাড়াই ২০১১ সালের ২০শে নভেম্বর আমাকে কাজ থেকে বের করে দেয়া হয়। পরে কিছুদিন অন্যত্র কাজ করলেও গত ৬ মাস বেকার ছিলাম। সেখানে বাংলাদেশী শ্রমিক আউট পাসের জন্য দূতাবাসে গেলে সহযোগিতা করা হয় না। যাদের পাসপোর্ট নেই তাদের রোহিঙ্গা বলে সহযোগিতা না করে দূতাবাস থেকে বিদায় করে দেয়া হয়। আলমগীরের সঙ্গে এই আচরণই করেছে দূতাবাস। কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার সাতিয়াদি গ্রামের কৃষক বাদল বিদেশ যাওয়ার আগে সুদে আড়াই লাখ টাকা নিয়েছিলেন। দেড় বছর পর গতকাল তিনিও ফিরেছেন খালি হাতে। কথা ছিল সুদ দেবেন ১ লাখ। যত দিন দিতে পারবেন না প্রতি ধানের মওসুমে তাকে দিতে হবে ১০ মণ করে ধান। দাদন ব্যবসায়ীকে সেই ধান পরিশোধ করছেন বছরে দুই বার করে। কিন্তু বিদেশে টাকা উপার্জন করতে না পারায় সুদের এক টাকাও ফেরত দিতে পারেননি তিনি। এখন দেশে ফেরার পর তার ভাগ্যে কি আছে তা নিয়ে আছেন চরম দুশ্চিন্তায়। বলেন, পুঁজি যা ছিল সব খুইয়েছি। কি করবো এখন ভেবে পাই না। আমার মতো হাজার হাজার শ্রমিক এভাবে ফিরছেন। সরকারের কোন আইনি সহায়তা তারা পান না। তাই অনেকে পাওনা টাকা না পেয়েই ফিরছেন। শ্রমিকরা জানান, অনেক ভুয়া কোম্পানি বাংলাদেশী শ্রমিকদের সেখানে নিয়েছে। তাদের জন্য প্রতারিত হয়েছেন। সেখানে দুঃখ-দুর্দশায় তারা কান্না করলেও শোনার কেউ নেই। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ সরকার ওই দেশগুলোকে কোন সুপারিশ করছে- এমন কথা তাদের জানা নেই।
No comments:
Post a Comment