ওসি হোসনে আরার চ্যালেঞ্জ
তিনি চ্যালেঞ্জ ভালবাসেন। পুলিশের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, জীবনটাকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই ব্যতিক্রমী চিন্তা ঠাঁই পায় তার মনে। ইচ্ছা জাগে পুলিশে যোগ দেয়ার। স্বপ্ন দেখেই থেমে থাকেননি তিনি। ১৯৮১ সালে ট্রেনিংয়ের জন্য ভর্তি হন পুলিশ ফোর্সে। দু’বছর পর প্রথম পিএসআই হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন গুলশান থানায়। তারপর এসআই হিসেবে ডেমরা থানায়। ২০১০ সালে যোগ দেন জাতিসংঘ মিশনে। এরপর তিনি ইতিহাসের অংশ। বাংলাদেশের প্রথম নারী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে যোগ দেন ক্যান্টনমেন্ট থানায়। তিনি হোসনে আরা। ৫১ বছর বয়সী এ নারী এখন ভাসানটেক থানার ওসি। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের একমাত্র নারী ওসি ৩২ বছর আগে পুলিশে যোগ দিতে গিয়ে পরিবারের কাছ থেকে কোন বাধার সম্মুখীন হননি। সবসময় পরিবারই তার পাশে ছিল। মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে হোসনে আরা তার সাফল্যের সব কৃতিত্ব দিয়েছেন পরিবারকে। গাজীপুরের পুবাইলে জন্মগ্রহণ করেছেন। বলেছেন, সাফল্যের পেছনে পরিবারের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। তিনি বলেন, বাবা মো. আলী ও মা আনোয়ারা বেগম সকল ক্ষেত্রে আমাকে প্রেরণা দিয়েছেন।
পুলিশে যোগ দেয়ার দু’বছর পর তার পিতা মারা যান। পাঁচ বোন এবং তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার বড়। পিতৃহারা পরিবারের সকল দায়িত্ব হাসিমুখে গ্রহণ করেন এই সাহসী নারী। সংসার জীবনের কথা ভাবার সুযোগ পাননি বলে জানান তিনি। তবে সৃষ্টিকর্তার হুকুম হলে এখনও বিয়েতে আপত্তি নেই। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাইলে ওসি হোসনে আরা বলেন, আমি দূর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবি না। বর্তমানের প্রতিটি দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে চাই। তিনি বলেন, পুরুষরা পারে- নারীরাও পারবে। প্রয়োজন শুধু সাহস ও সদিচ্ছার। আশা করি শুধু আমি নই, আমার পরেও অনেক নারী এই পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোন প্রতিবন্ধকতা সম্মুখীন হতে হয় কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি নারী হিসেবে কখনও কোন প্রতিবন্ধকতার শিকার হইনি। আমি মনে করি নারী হওয়ার কারণে অনেক ঘটনা তদন্ত করতে আমার সহজ হয়। নারী বিষয়ক ঘটনা, যেমন ধর্ষণের শিকার অথবা নির্যাতিত নারীদের সঙ্গে কথা বলে সহজেই রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়। একজন পুরুষ ওসির সঙ্গে এই ধরনের ভিকটিমরা কথা বলতে অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন, যা মামলার অগ্রগতির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে যখন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার শিকার হতে হয়, তখন আমার কষ্ট হয়। দায়িত্ব পালনে অনড় এই নারী জানান একজন নারী হিসেবে তার নানা অভিজ্ঞতার কথা।
হোসনে আরার প্রতিদিনের কার্যক্রমের অন্যতম থানাধীন এলাকা টহল দেয়া। রাত দুটা হোক বা তিনটাই হোক নিজেই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েন জনগণের নিরাপত্তার খোঁজখবর নিতে। তিনি বলেন, নারী হওয়াকে প্রতিবন্ধকতা না ভেবে আমি যে কোন বৈরী পরিস্থিতি উপেক্ষা করে একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে আমার যা কর্তব্য তা পালন করি। অনান্য অপরাধের চেয়ে, মাদক সংক্রান্ত অভিযানগুলোই মূলত আমার নেতৃত্বে পরিচালিত হয়ে থাকে। মাসে প্রায় ১৫টি মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে এর সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে থাকেন বলে জানান তিনি।
পুলিশ টিমে একজন জাতীয় গান শুটারও এই নারী। পুলিশ টিমে একজন শুটার হিসেবে রয়েছে তার আলাদা কৃতিত্ব। ২০০৯ সালে জাতীয় মহিলা পুলিশ টিমে গান শুটারে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। প্রতি বছর এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছেন হোসনে আরা।
ভাষানটেক থানা এলাকার উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণ যাতে পুলিশকে বন্ধু ও সহযোগী ভাবতে পারে তার জন্য তাদের সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ গড়ে তুলতে চাই। জনগণ পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পায়। যোগাযোগের মাধ্যমেই তা দূর হবে।
এ লক্ষ্যে ভাষানটেক থানায় কিছু দিনের মধ্যে একটি কমিউনিটি আলোচনার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেবেন বলে জানান তিনি। মিরপুরের ডিসি ইমতিয়াজ আহমেদ, এসবির ডিআইজি ফাতেমা আক্তার, এসবি ট্রেনিং ইনস্টিটিউশনের বর্তমান এডিশনাল ডিআইজি ইয়াসমিন গোফুর, জয়েন্ট কমিশন অব ট্রাফিকের মিলি বিশ্বাস এবং র্যাবের এডিশনাল ডিআইজি রওসনারা বেগমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার পেশাগত জীবনে এ সকল মানুষের বিরাট অবদান রয়েছে। সফলতার সকল ক্ষেত্রে আমি তাদের সহযোগিতা পেয়েছি।
No comments:
Post a Comment